প্রাণী

বিড়ালকে পানি পান করানো

প্রিয় পাঠক, আপনার বিড়াল যদি পানির পাত্রটিকে এমনভাবে উপেক্ষা করে, যেন সেটি ঘরের কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসই নয়, তাহলে চিন্তার কিছুটা কারণ থাকলেও আপনি একা নন।
অনেক বিড়ালই প্রত্যাশার তুলনায় কম পানি পান করে। এর ফলে পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মূত্রনালীর বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বিড়ালকে জোর করে পানি পান করানোর প্রয়োজন নেই।
বরং ঘরের পরিবেশে কয়েকটি ছোট অথচ বুদ্ধিদীপ্ত পরিবর্তন আনলে তাকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি তরল গ্রহণে উৎসাহিত করা সম্ভব।
বিষয়টিকে কঠোর প্রশিক্ষণের মতো না দেখে বরং একজন খুঁতখুঁতে সঙ্গীর পছন্দ বোঝার চেষ্টা হিসেবে ভাবুন। বিড়ালের স্বাভাবিক তৃষ্ণাবোধ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। তাদের বন্য পূর্বপুরুষেরা শিকার করা খাবার থেকেই শরীরের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার একটি বড় অংশ পেত। এ কারণে অনেক বিড়াল পর্যাপ্ত পানি পান করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না।
এক্ষেত্রে খাবারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুকনো খাবারের তুলনায় ভেজা খাবারে সাধারণত অনেক বেশি আর্দ্রতা থাকে। তাই বিড়ালের খাদ্যতালিকায় উপযুক্ত পরিমাণে ভেজা খাবার, যেমন ক্যানজাত খাবার, অন্তর্ভুক্ত করলে খাবারের মাধ্যমেই তার শরীরে তরল গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

পানির পাত্রকে করে তুলুন আরও আকর্ষণীয়

বিড়াল পানি পান করার ক্ষেত্রেও বেশ খুঁতখুঁতে হতে পারে। কেউ সদ্য বদলে দেওয়া পরিষ্কার পানি পছন্দ করে, আবার কেউ পানির পাত্র খাবারের জায়গা বা লিটার বক্সের খুব কাছে থাকলে সেটি এড়িয়ে চলে। তাই বিড়ালের পছন্দ বোঝার জন্য বাড়ির বিভিন্ন শান্ত জায়গায় কয়েকটি পানির পাত্র রেখে দেখতে পারেন।
বিড়াল ঘরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘোরাফেরা করার সময় কাছাকাছি পানি পেলে পান করার সুযোগও বাড়ে। তবে পাত্রগুলো এমন স্থানে রাখুন, যেখানে বিড়াল স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে পারে এবং নিশ্চিন্তে পানি পান করতে পারে।
পাত্রের আকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিড়াল চওড়া ও অগভীর পাত্র পছন্দ করে, কারণ এতে পান করার সময় তাদের গোঁফের সঙ্গে পাত্রের কিনারার ঘন ঘন সংস্পর্শ হয় না। এই ছোট পরিবর্তনটি কিছু বিড়ালের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
চলমান পানির প্রতিও অনেক বিড়ালের আগ্রহ দেখা যায়। তাদের জন্য তৈরি পানির ফোয়ারা (pet fountain) ব্যবহার করে দেখতে পারেন। প্রবাহিত পানির শব্দ ও নড়াচড়া বিড়ালকে পানির প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে। তবে ফোয়ারা ব্যবহার করলে নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। ফিল্টার ও পানির প্রবাহ ঠিক আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করুন। নোংরা বা পিচ্ছিল পাত্র কিংবা ফোয়ারা বিড়ালের কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার বদলে বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

খাবারের মাধ্যমেই বাড়ান তরল গ্রহণের পরিমাণ

আপনার বিড়াল যদি মূলত শুকনো খাবার খায়, তাহলে খাবারের মাধ্যমেও তার শরীরে আর্দ্রতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। উপযুক্ত ভেজা খাবার দেওয়া এর একটি সহজ উপায়। তবে খাবার পরিবর্তনের আগে বিড়ালের বয়স, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করা উচিত।
বিড়াল শুকনো খাবার পছন্দ করলে তাতে অল্প পানি মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে শুরুতেই অনেক পানি যোগ করবেন না। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনুন, যাতে খাবারের গঠন বা স্বাদ বদলে যাওয়ায় বিড়াল পুরো খাবারটি প্রত্যাখ্যান না করে। ভেজা করে দেওয়া খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে ফেলে রাখবেন না, কারণ এতে খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিছু বিড়াল ঝোল বা ব্রথ খেতেও পছন্দ করে। এ ক্ষেত্রে বিড়ালের জন্য নিরাপদ, কম লবণযুক্ত এবং পেঁয়াজ-রসুনমুক্ত উপাদান বেছে নেওয়া জরুরি। পেঁয়াজ ও রসুন বিড়ালের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। তাই মানুষের খাবারের ঝোল বা মসলা দেওয়া স্যুপ না দিয়ে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য ব্যবহার করুন।
পানি পরিবেশনের ধরনেও কিছু পরিবর্তন এনে দেখতে পারেন। কেউ ঠান্ডা পানি পছন্দ করে, আবার কেউ সাধারণ তাপমাত্রার পানি পান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একইভাবে কাচ, সিরামিক ও স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রের প্রতিও বিড়ালের পছন্দ আলাদা হতে পারে।
বিড়াল যেন লোমশ আবরণে ঢাকা একেকজন খুঁতখুঁতে সমালোচক! তাই কোন ধরনের পানি বা পাত্র তার ভালো লাগে, তা বোঝার জন্য একবারে একটি পরিবর্তন করে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করুন।

পানি কম পান করার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে স্বাস্থ্যগত সমস্যা

বিড়াল কম পানি পান করছে মানেই যে তার স্বভাব এমন, তা নয়। কখনো মানসিক চাপ, অপরিচ্ছন্ন পাত্র কিংবা আশপাশের পরিবেশের অস্বস্তির কারণে সে পানি এড়িয়ে চলতে পারে। আবার মুখের সমস্যা, দাঁতে ব্যথা, পরিপাকতন্ত্রের অসুস্থতা কিংবা মূত্রনালীর সমস্যাও পান করার অভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
আপনার বিড়াল হঠাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পানি পান করতে শুরু করলে তার আচরণ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলোর দিকেও নজর দিন—
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা নিস্তেজ ভাব।
- খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমে যাওয়া।
- বমি হওয়া।
- প্রস্রাবের পরিমাণ বা অভ্যাসে পরিবর্তন।
- মলত্যাগে অসুবিধা বা কোষ্ঠকাঠিন্য।
- মুখে অস্বস্তি কিংবা খাবার চিবাতে সমস্যা।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে বিড়াল বারবার প্রস্রাব করার চেষ্টা করলেও প্রস্রাব বের না হলে, অথবা খুব অল্প প্রস্রাব হলে, এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে—বিশেষত পুরুষ বিড়ালের ক্ষেত্রে। এমন পরিস্থিতিতে অপেক্ষা না করে অবিলম্বে পশুচিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যান।
অন্যদিকে, বিড়াল যদি হঠাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পানি পান করে, সেটিও উপেক্ষা করা উচিত নয়। কিডনি বা বিপাকীয় সমস্যাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণে তৃষ্ণা বেড়ে যেতে পারে। তাই পানির পরিমাণে স্থায়ী বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্ন পানি ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করুন

বিড়ালকে পানি পান করতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পানির পাত্র ধুয়ে তাতে নতুন ও পরিষ্কার পানি দিন। পাত্রে জমে থাকা পশম, ধুলোবালি কিংবা খাবারের কণা সরিয়ে ফেলুন। প্রয়োজনে পাত্রটি প্রতিদিন আরও বেশি বার পরিষ্কার করুন।
পানির পাত্র কোথায় রাখা হচ্ছে, সেটিও খেয়াল করুন। বিড়াল সাধারণত এমন জায়গায় পানি পান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, যেখানে অতিরিক্ত শব্দ, মানুষের চলাচল বা অন্য প্রাণীর বিরক্তি কম থাকে। খাবারের পাত্র ও লিটার বক্স থেকে কিছুটা দূরে পানি রাখলে অনেক বিড়ালের জন্য পরিবেশটি আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
একাধিক বিড়াল থাকলে তাদের জন্য আলাদা পানির পাত্র রাখার কথাও বিবেচনা করুন। এতে প্রতিযোগিতা বা অন্য বিড়ালের কারণে পানি পান করতে বাধা পাওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিড়ালকে জোর করে পানি পান করানোর চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে সিরিঞ্জ দিয়ে জোর করে পানি খাওয়ালে তা শ্বাসনালিতে ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিড়াল পর্যাপ্ত পানি পান করছে না বলে সন্দেহ হলে নিরাপদ উপায় বেছে নিতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ছোট ছোট পরিবর্তনেই হতে পারে বড় উপকার

বিড়ালকে বেশি পানি পান করানোর মূল কৌশল হলো পানিকে তার কাছে সহজলভ্য, সতেজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা। খাবারে উপযুক্ত পরিমাণে ভেজা খাবার যোগ করা, বাড়ির বিভিন্ন শান্ত স্থানে পানির পাত্র রাখা, চওড়া পাত্র ব্যবহার করা কিংবা পানির ফোয়ারা চেষ্টা করার মাধ্যমে তার পছন্দের উপায়টি খুঁজে বের করতে পারেন।
একই সঙ্গে পাত্র পরিষ্কার রাখা, প্রতিদিন নতুন পানি দেওয়া এবং বিড়ালের পান করার অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। কোনো একটি পদ্ধতি সব বিড়ালের ক্ষেত্রে সমান কার্যকর হবে না। তাই আপনার পোষা বিড়ালের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনুন।
মনে রাখবেন, পানি পান করার অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে ধৈর্য প্রয়োজন। আর বিড়াল হঠাৎ পানি পান কমিয়ে দিলে বা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে শুধু ঘরোয়া কৌশলের ওপর নির্ভর না করে পশুচিকিৎসকের সাহায্য নিন। সঠিক যত্ন ও ছোটখাটো কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমেই আপনার আদরের বিড়ালকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে তরল গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারবেন।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন