প্রাণী

বাড়িতে কচ্ছপ পুষতে

প্রিয় পাঠক! বাড়িতে একটি কচ্ছপ আনার কথা ভাবলে প্রথমেই মনে হতে পারে, এর চেয়ে শান্ত ও নিরীহ সঙ্গী আর কী হতে পারে! নিজের পিঠেই যেন নিজের ঘর বয়ে বেড়ায় এই ছোট্ট প্রাণীটি।
কিন্তু কচ্ছপটি বাড়িতে আনার আগেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার খরচ আপনার সামনে হাজির হতে পারে এক অনাহূত অতিথির মতো। আর সেই খরচের তালিকাও মোটেই ছোট নয়!
কচ্ছপের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা মানে শুধু একটি ট্যাঙ্ক কিনে তাতে কিছুটা জল ভরে দেওয়া নয়। বরং কচ্ছপের প্রজাতি অনুযায়ী সঠিক আকারের বাসস্থান, রোদ পোহানোর জায়গা (basking area), উপযুক্ত আলো ও তাপের ব্যবস্থা, জল পরিশোধনের ফিল্টার, তলদেশের উপকরণ (substrate), খাবার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জামসহ বেশ কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। শুরুতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো উপেক্ষা করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কচ্ছপের স্বাস্থ্যের ওপর। পাশাপাশি, পরে ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে আপনার খরচও বেড়ে যেতে পারে।

কচ্ছপের বাসস্থান বা ট্যাঙ্কেই সবচেয়ে বেশি খরচ হতে পারে

কচ্ছপের স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন। আর এখানেই শুরু হয় বড় অঙ্কের খরচ। জলচর কচ্ছপের জন্য সাধারণত বড় অ্যাকোয়ারিয়াম বা উপযুক্ত আকারের পাত্র দরকার হয়, যেখানে তারা স্বচ্ছন্দে সাঁতার কাটতে এবং সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
দোকানের তাকে সাজানো ছোট ছোট পাত্র দেখতে আকর্ষণীয় লাগলেও, সেগুলোতে কচ্ছপ রাখা তার জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর হতে পারে। বিষয়টি অনেকটা ছোট একটি আলমারির মধ্যে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার মতো। অনেকেই প্রথমে ছোট পাত্র কিনে পরে বুঝতে পারেন যে সেটিতে কচ্ছপের প্রয়োজনীয় জায়গা নেই। ফলে আবার বড় ট্যাঙ্ক কিনতে হয়, আর একই কাজে দুবার টাকা খরচ হয়ে যায়।
তাই শুরু থেকেই কচ্ছপের প্রজাতি, সম্ভাব্য পূর্ণবয়স্ক আকার এবং চলাফেরার প্রয়োজন বিবেচনা করে উপযুক্ত ট্যাঙ্ক বেছে নেওয়া জরুরি। কারণ, ট্যাঙ্কের আকারের ওপর নির্ভর করেই অন্যান্য সরঞ্জামের ধরন ও খরচ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ, পুরো বাজেটের ভিত্তি হলো কচ্ছপের বাসস্থান।

তাপ ও আলো: সুস্থ কচ্ছপের জন্য অপরিহার্য ব্যবস্থা

কচ্ছপকে সুস্থ রাখতে উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং অতিবেগুনি রশ্মির (ultraviolet light) ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সাধারণত শরীর গরম করার ল্যাম্প (basking lamp) এবং খোলস ও শরীরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ইউভিবি (UVB) ল্যাম্প ব্যবহার করতে হয়।
তবে এই ল্যাম্পগুলো একবার কিনলেই বছরের পর বছর নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। বাল্ব বাইরে থেকে জ্বলতে দেখা গেলেও নির্দিষ্ট সময় পর তার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সময়মতো বাল্ব পরিবর্তন করতে হয়। বিষয়টি অনেকটা ঘরের সিলিং ল্যাম্পের মতো—বাইরে থেকে ঠিকঠাক মনে হলেও, সেটি হয়তো আর প্রয়োজনীয় কাজটি সঠিকভাবে করতে পারছে না।
এর পাশাপাশি ল্যাম্পের ফিক্সচার, ডোম, টাইমার এবং নিরাপদে স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতেও টাকা খরচ হয়। নতুন কচ্ছপের মালিকেরা প্রায়ই এই নিয়মিত ব্যয়ের কথা শুরুতে হিসাবের মধ্যে রাখেন না। অথচ আলো ও তাপের ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সময়মতো সরঞ্জাম পরিবর্তন করাও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জল পরিষ্কার রাখার পেছনেও রয়েছে বাড়তি খরচ

জলচর কচ্ছপ পালনের ক্ষেত্রে জল পরিশোধনের ব্যবস্থা বা ফিল্টার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের খাত। কচ্ছপের কারণে ট্যাঙ্কের জল দ্রুত নোংরা হয়ে যেতে পারে। তাই দুর্বল ক্ষমতার ফিল্টার ব্যবহার করলে পরিষ্কার জলও অল্প সময়ের মধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের আয়তনের তুলনায় বেশি কার্যকর ফিল্টার ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ফিল্টারের ভেতরের উপাদান (filter media) পরিষ্কার করা বা প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করা এবং যন্ত্রটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এখানেই শেষ নয়। জল পরিষ্কারের সাইফন, প্রয়োজনে জল কন্ডিশনার, জলের গুণমান পরীক্ষা করার টেস্ট কিট এবং অন্যান্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জামও প্রয়োজন হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে কচ্ছপের বাসস্থানের একটি কোণ যেন ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়!
এসব সরঞ্জাম হয়তো দেখতে খুব আকর্ষণীয় নয়, কিন্তু এগুলো কচ্ছপের বাসস্থান পরিষ্কার ও স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নিয়মিত পরিচর্যাও অনেক সহজ হয়ে ওঠে।

বাস্কিং জোন ও ট্যাঙ্কের সাজসজ্জাতেও বাড়ে বাজেট

কচ্ছপের জন্য এমন একটি শুকনো জায়গা বা ‘বাস্কিং প্ল্যাটফর্ম’ থাকা প্রয়োজন, যেখানে সে জল থেকে পুরোপুরি উঠে এসে শরীর গরম করতে পারে। বাসস্থানের ধরন অনুযায়ী এটি ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, স্থায়ী কাঠামো কিংবা ট্যাঙ্কের ভেতরে তৈরি কোনো উঁচু অংশ হতে পারে।
জলের তাপমাত্রা এবং বাস্কিং এলাকার উষ্ণতা পর্যবেক্ষণ করার জন্য থার্মোমিটারও প্রয়োজন হতে পারে। কচ্ছপের প্রজাতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে জলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিটার ব্যবহারেরও দরকার হতে পারে।
এ ছাড়া ট্যাঙ্কের ভেতরের সাজসজ্জা, লুকিয়ে থাকার জায়গা এবং তলদেশের উপকরণ বা সাবস্ট্রেটের খরচও বাজেটে যোগ হয়। প্রথমে এগুলোকে ছোটখাটো বাড়তি সংযোজন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি জিনিসের দাম একসঙ্গে হিসাব করলে মোট ব্যয় বেশ বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই শুধু ট্যাঙ্ক কিনলেই কচ্ছপের বাসস্থান তৈরির কাজ শেষ হয়ে যায় না। তার স্বাভাবিক আচরণ, নিরাপত্তা এবং আরামের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি উপকরণ আগে থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা ভালো।

খাবার ও নিয়মিত পরিচর্যার খরচ ভুলে যাবেন না

কচ্ছপের বাসস্থান তৈরি করার পরও খরচের হিসাব শেষ হয় না। প্রজাতি অনুযায়ী তার জন্য সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হয়। অনেক মালিক খাবারে বৈচিত্র্য আনতে দানাদার খাবার বা প্যালেট, শাকসবজি এবং প্রজাতির জন্য উপযোগী অন্যান্য খাবার পর্যায়ক্রমে দিয়ে থাকেন। প্রয়োজন অনুসারে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টও খাদ্যতালিকায় যুক্ত করতে হতে পারে।
এর পাশাপাশি রয়েছে নিয়মিত কিছু খরচ—যেমন ল্যাম্পের বাল্ব পরিবর্তন, ফিল্টারের উপাদান কেনা, পরিষ্কারের সামগ্রী সংগ্রহ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসস্থানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা উন্নয়ন। শুরুতে বড় অঙ্কের কেনাকাটার খরচ সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু প্রতি মাসের ছোট ছোট ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে আপনার বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কচ্ছপ পালনের খরচ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, কচ্ছপটি নিজে হয়তো খুব বেশি দামের নয়; বরং তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং সেটি দীর্ঘদিন ভালোভাবে বজায় রাখাই তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।
শুরু থেকেই পরিকল্পনা করে বাসস্থান তৈরি করলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো সম্ভব। এতে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি কচ্ছপের মানসিক চাপ কমে এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
তাই বাড়িতে কচ্ছপ আনার আগে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করুন এবং প্রতিটি জিনিসের সম্ভাব্য দাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন। কচ্ছপ দেখতে শান্ত ও সাধারণ মনে হলেও, তার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা বেশ দীর্ঘ হতে পারে। আগেভাগে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে পরে খরচের হিসাব দেখে হতাশ হতে হবে না; বরং নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারবেন আপনার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে কাটানো সময়।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন