প্রাণী
পাখিরা চেহারা চিনতে পারে?
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, পাখিরা কি জানে তাদের দেখতে কেমন? পাখিরা পরিচিত সঙ্গীদের চিনতে পারে এবং অন্য পাখির শারীরিক গঠন কিংবা ডাকের প্রতি সাড়া দেয়।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নিজেদের চেহারা সম্পর্কে তাদের মনে স্পষ্ট কোনো ধারণা রয়েছে। বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যখন কোনো পাখি আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তখন কি সে নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে, নাকি আয়নায় দেখা পাখিটিকে অন্য কেউ বলে মনে করে? নাকি বিষয়টি এতটা সরল নয়?
অন্য পাখিদের পর্যবেক্ষণ করেই কি তারা নিজেদের প্রজাতিকে চিনতে শেখে?
পাখির ছানারা বাবা-মা, ভাইবোন এবং আশপাশের অন্যান্য পাখির কাছ থেকে নিজেদের প্রজাতি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেখে। পাখির শারীরিক গঠন, চলাফেরা এবং ডাক তাদের পরিচিত সঙ্গী কিংবা সম্ভাব্য সঙ্গীদের শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
তবে শুধু অভিজ্ঞতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে না। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে জন্মগত প্রবণতাও প্রভাব ফেলে, তারা কোন পাখিকে চিনবে বা কার কাছে যাবে। অন্য প্রজাতির পাখির কাছে বেড়ে ওঠা ছানাদের—যেমন অন্য পাখির বাসায় লালিত-পালিত পরজীবী পাখিদের—নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শেখা অভিজ্ঞতা ও জন্মগত প্রবণতা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে।
তবে নিজের প্রজাতির অন্য সদস্যদের চিনতে পারা আর নিজের শরীর দেখতে কেমন, তা জানা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি পাখি অন্য পাখিকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারলেও, তার সঙ্গে নিজের শারীরিক গঠনের তুলনা করার প্রয়োজন বোধ নাও করতে পারে।

পরিচিত পাখিদের আলাদা করে চিনতে পারে তারা কীভাবে?
অনেক পাখি অন্য পাখিদের ডাক, গান, শারীরিক বৈশিষ্ট্য কিংবা বিভিন্ন সংকেতের সমন্বয়ের মাধ্যমে আলাদা করে চিনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু গায়ক পাখি প্রতিবেশী পাখিদের ডাক শুনেই তাদের শনাক্ত করতে পারে। আবার কিছু প্রজাতি শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একেকটি পাখিকে আলাদা করে চিনতে সক্ষম।
পাখিরা নিজেদের গানের রেকর্ডিং এবং অন্য পাখির গানের রেকর্ডিং শুনেও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। কিন্তু পরিচিত কোনো শব্দ, এমনকি নিজের ডাক চিনতে পারার অর্থ এই নয় যে, পাখিটি নিজের চেহারা সম্পর্কেও সচেতন।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্য কাউকে শনাক্ত করা এবং নিজেকে শনাক্ত করার ক্ষমতা যাচাই করতে ভিন্ন ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন। পাখিরা নিজেদের দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রায়ই আয়না ব্যবহার করেন।
‘মিরর টেস্ট’ বা আয়না পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে?
প্রাণীদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারার ক্ষমতা যাচাই করার একটি বহুল পরিচিত পদ্ধতি হলো ‘মিরর সেলফ-রিকগনিশন টেস্ট’। একে অনেক সময় ‘মার্ক টেস্ট’ বা চিহ্ন পরীক্ষাও বলা হয়। এই পরীক্ষায় প্রথমে প্রাণীটিকে আয়নার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর তার শরীরের এমন কোনো স্থানে দৃশ্যমান চিহ্ন দেওয়া হয়, যা সে সাধারণত সরাসরি দেখতে পারে না।
যদি প্রাণীটি আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবিকে অন্য কোনো প্রাণী বলে মনে না করে, বরং আয়নার সাহায্যে নিজের শরীরের চিহ্নিত অংশটি পরীক্ষা করতে বা স্পর্শ করতে চেষ্টা করে, তাহলে গবেষকেরা এই আচরণকে আয়নায় নিজেকে চিনতে পারার সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে নিয়ন্ত্রিত অবস্থাও ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, প্রাণীটি শরীরে কোনো কিছু অনুভব করার কারণে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, নাকি আয়নায় দৃশ্যমান চিহ্নটির প্রতি সাড়া দিচ্ছে।
তবে এই পরীক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো প্রাণী নিজের নড়াচড়া এবং আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবির নড়াচড়ার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারলেও, নিজের শরীরে থাকা চিহ্নটি পরীক্ষা করার প্রয়োজন অনুভব নাও করতে পারে। তাই আয়না পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেই যে প্রাণীটির মধ্যে আত্মসচেতনতার কোনো রূপ নেই, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
পাখিদের ক্ষেত্রে এই গবেষণা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
আত্ম-স্বীকৃতি বা নিজেকে চিনতে পারার ক্ষমতা নিয়ে গবেষণায় পাখিরা বিশেষ আগ্রহের বিষয়। এর কারণ হলো, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় পাখিদের মস্তিষ্কের গঠন ভিন্ন হলেও, কিছু প্রজাতির মধ্যে জটিল সমস্যা সমাধান, উন্নত স্মৃতিশক্তি এবং জটিল সামাজিক আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০০৮ সালে ইউরেশিয়ান ম্যাগপাই নামের এক ধরনের পাখি এই গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। গবেষক হেলমুট প্রায়র, আরিয়ান শোয়ার্জ এবং ওনুর গুনতুর্কুন ‘পিএলওএস বায়োলজি’ (PLOS Biology) সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানান, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পাঁচটি ম্যাগপাইয়ের মধ্যে দুটি এমন আচরণ করেছিল, যা আয়নায় নিজেকে চিনতে পারার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, পাখি দুটি নিজেদের শরীরে লাগানো চিহ্নটির দিকে মনোযোগ দিয়েছিল।
কিন্তু ২০২০ সালে ম্যানুয়েল সোলার ও তাঁর সহকর্মীরা ‘জার্নাল অব কম্পারেটিভ সাইকোলজি’ (Journal of Comparative Psychology) সাময়িকীতে আগের গবেষণার পুনরাবৃত্তি প্রকাশ করেন। সেখানে পূর্ববর্তী গবেষণার একই ফলাফল পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, ম্যাগপাইরা আয়না পরীক্ষায় নির্ভরযোগ্যভাবে নিজেকে চিনতে পারে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এই ফলাফল থেকে অবশ্য এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, ম্যাগপাইদের নিজেদের চিনতে পারার ক্ষমতা নেই। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, কোনো গবেষণায় আকর্ষণীয় ফলাফল পাওয়া গেলেই সেটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আয়নায় নিজেকে দেখা মানেই কি নিজের চেহারা সম্পর্কে সচেতন হওয়া?
নিজেকে চেনার ক্ষমতা কোনো একক দক্ষতা নয়; বরং এটি একাধিক সক্ষমতার সমন্বয় হতে পারে। একটি পাখি বুঝতে পারে যে সে নড়াচড়া করলে আয়নায় তার প্রতিচ্ছবিও নড়ে। আবার সে আয়নার সাহায্যে কোনো বস্তু খুঁজে বের করতে শিখতে পারে, কিংবা আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবিটিকে নিজের শরীর হিসেবে শনাক্ত করতে পারে। এসব ক্ষমতার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকলেও, এগুলো একেবারে একই বিষয় নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আয়নার সামনে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে। কিছু পাখি প্রতিচ্ছবির সামনে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেন সেখানে অন্য একটি পাখি রয়েছে। অন্যদিকে, কিছু পাখি আয়নাটি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে অথবা আয়নায় দেখা তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো কাজ সম্পন্ন করে।
এমনকি কোনো পাখি যদি আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতেও পারে, তবুও এর অর্থ এই নয় যে, তার মনে নিজের বাহ্যিক চেহারা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো মানসিক ছবি রয়েছে। আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবিটি যে নিজের শরীরেরই প্রতিফলন, তা বুঝতে পারা এবং নিজের চেহারা ঠিক কেমন, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয়টি আরও নির্দিষ্ট এবং জটিল একটি দাবি।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা কেবল আয়না পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করেন না। তাঁরা পাখিদের শেখার ক্ষমতা, উপলব্ধি, সামাজিক স্বীকৃতি এবং অন্যান্য আচরণও পর্যবেক্ষণ করেন। অন্য পাখিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পাখিদের দক্ষতা যে বেশ উন্নত, তা স্পষ্ট। তবে তারা নিজেদের চেহারা সম্পর্কে কতটা সচেতন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। আয়না নিয়ে করা পরীক্ষাগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও, বিশেষ করে পাখিরা যখন নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে অপ্রত্যাশিত আচরণ করে, তখনও এসব ফলাফলের ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্য পাখিকে শনাক্ত করা, আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবির অর্থ বোঝা এবং নিজের শরীর দেখতে কেমন, তা জানা—এই তিনটি আলাদা সক্ষমতা। পাখিদের মধ্যে এর কয়েকটির প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন। তবে এই তিনটি ক্ষমতা যে পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।