প্রাণী

মরুভূমির গরমে উট

মরুভূমিতে দিনের বেলা তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেড়ে যেতে পারে, অথচ সূর্য ডোবার পরই পরিবেশ অনেক ঠান্ডা হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে পানির তীব্র সংকটও দেখা দিতে পারে।
এমন প্রতিকূল পরিবেশেও উট অসাধারণ দক্ষতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তাদের এই সক্ষমতা কোনো একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বরং শরীরের তাপমাত্রা নমনীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ, পানি সাশ্রয়ের কার্যকর ব্যবস্থা, সুরক্ষামূলক পশম এবং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই আচরণের সমন্বয়ই তাদের মরুভূমিতে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের অসাধারণ ক্ষমতা

উট কীভাবে মরুভূমির প্রচণ্ড গরম সহ্য করে, তার অন্যতম প্রধান রহস্য হলো শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন মেনে নেওয়ার ক্ষমতা। মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সাধারণত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু উটের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে তারা শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে দিতে পারে।
পানিশূন্যতার পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতা বিশেষভাবে কাজে আসে। তখন দিন ও রাতের মধ্যে উটের শরীরের তাপমাত্রায় কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত পার্থক্য দেখা দিতে পারে। ফলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ দূর করতে ঘামের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন কিছুটা কমে যায়।
শরীরের তাপমাত্রা সব সময় একই মাত্রায় ধরে রাখতে পানি খরচ করার পরিবর্তে, উট দিনের বেলায় শরীরে কিছুটা তাপ জমতে দেয়। পরে চারপাশের পরিবেশ ঠান্ডা হলে সেই তাপ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে পারে। এতে পানি সংরক্ষণ করা সহজ হয়। তবে প্রচণ্ড গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিরাপদ সীমায় রাখতে উটেরও ঘাম ঝরানো ও বাষ্পীভবনের মতো শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।

প্রচণ্ড গরমেও কীভাবে পানি সাশ্রয় করে উট?

উটের তাপ সহ্য করার ক্ষমতার পাশাপাশি পানি সংরক্ষণের দক্ষতাও তাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির অভাব দেখা দিলে তাদের শরীর বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় আর্দ্রতা হারানো কমিয়ে দেয়।
অন্যান্য অনেক বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় উট পানিশূন্যতা বেশি সহ্য করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাদের পানির প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘ সময় পানি না পেলে কিংবা অতিরিক্ত পানিশূন্যতা দেখা দিলে উটও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
ঘাম ঝরানোর ক্ষেত্রেও উটের শরীর বিশেষভাবে অভিযোজিত। প্রয়োজন হলে তারা ঘামে, কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি হতে পারে। এর ফলে প্রচণ্ড গরমের সময় শরীর থেকে তুলনামূলক কম পানি হারিয়ে তারা দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকতে পারে।

ঘন পশম কি উটকে গরম থেকে রক্ষা করে?

মরুভূমির প্রচণ্ড গরমে উটের ঘন পশম দেখলে মনে হতে পারে, এটি তাদের শরীরকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে এই পশম সূর্যের তীব্র তাপ থেকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পশমের আবরণ তাপ নিরোধকের মতো কাজ করে। এটি সূর্যের বিকিরণ থেকে আসা তাপ সরাসরি ত্বকে পৌঁছানোর গতি কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরে তাপ প্রবেশের হার কমে এবং অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা করার প্রয়োজনও কিছুটা হ্রাস পায়।
উটের শরীরের সব জায়গায় পশমের ঘনত্ব সমান নয়। সূর্যের আলো, বাতাসের তাপমাত্রা এবং বাতাসের গতির মতো বিভিন্ন বিষয় এর তাপ নিরোধক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। পশমের আবরণ উটকে পুরোপুরি গরম থেকে রক্ষা করতে পারে না, তবে তীব্র রোদে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
রাতে মরুভূমির তাপমাত্রা কমে গেলে একই পশম শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যাওয়ার গতিও ধীর করে দেয়। অর্থাৎ, দিনের গরম ও রাতের ঠান্ডা—দুই পরিস্থিতিতেই উটের পশমের আবরণ কার্যকর ভূমিকা রাখে।

শুধু শরীরের গঠন নয়, আচরণও তাদের বাঁচিয়ে রাখে

উটের টিকে থাকার পেছনে কেবল শারীরিক অভিযোজনই কাজ করে না; মরুভূমির পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তারা নিজেদের আচরণও পরিবর্তন করে।
প্রচণ্ড গরমের সময় উট অপ্রয়োজনীয় চলাফেরা ও শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি, এমনভাবে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে, যাতে শরীর সরাসরি সূর্যের আলোয় কম উন্মুক্ত থাকে। বিশ্রাম নেওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলার ফলে শরীরের ভেতরে উৎপন্ন তাপের পরিমাণও কমে যায়।
উটের পায়ের পাতা চওড়া ও নরম গদির মতো হওয়ায় শরীরের ওজন তুলনামূলক বড় জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বালুর ওপর হাঁটার সময় তাদের পা খুব বেশি গভীরে দেবে যায় না। সরু খুরযুক্ত অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে বালুময় পথে চলাচল করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া, উটের লম্বা পা তাদের শরীরকে উত্তপ্ত মাটি থেকে বেশ খানিকটা ওপরে রাখে। এতে মাটির কাছাকাছি থাকা তাপের সরাসরি প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্য একত্রে তাদের বালুময় ও অসমতল ভূখণ্ডে চলাচল করতে এবং প্রচণ্ড তাপের মতো শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।

উটের শরীরের এই অভিযোজনগুলো একসঙ্গে কীভাবে কাজ করে?

কেবল একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না যে উট কীভাবে মরুভূমির প্রচণ্ড গরম সহ্য করে। তাদের টিকে থাকার সাফল্য নির্ভর করে একাধিক শারীরিক প্রক্রিয়া ও আচরণের সমন্বয়ের ওপর।
ধরা যাক, একটি উট গরম ও শুষ্ক দিনে মরুভূমির মধ্য দিয়ে চলেছে। তার পশমের আবরণ সূর্যের তাপ শরীরে প্রবেশ করার গতি কমিয়ে দেয়। একই সময়ে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ঘাম ঝরানোর প্রয়োজন হয় না। তার বৃক্ক বা কিডনি এবং পরিপাকতন্ত্র শরীর থেকে পানি হারানো কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, চওড়া পায়ের পাতা বালুময় পথে চলাচলকে সহজ করে তোলে।
সূর্যাস্তের পর চারপাশের পরিবেশ ঠান্ডা হয়ে এলে উট দিনের বেলায় শরীরে জমা হওয়া তাপের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে পারে। পানি পাওয়ার সুযোগ থাকলে তারা পান করে শরীরের হারানো তরল পূরণ করতে পারে। আর পানি সহজলভ্য না হলেও তাদের বিশেষ অভিযোজনগুলো দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্মিলিতভাবে শরীর থেকে পানির ক্ষয় কমায় এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও উটকে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে। তবে উট মরুভূমির গরম সহ্য করতে পারে বলেই যে তাপ তাদের শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে না, তা নয়। বরং তাদের শরীর তাপ ও পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত দক্ষ।
শরীরের তাপমাত্রা নমনীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, তাপ নিরোধক পশম, পানি সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং চলাচলের উপযোগী শারীরিক গঠন—সবকিছুই তাদের এই অসাধারণ সক্ষমতার পেছনে কাজ করে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, উটের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো দেখে প্রথমে মনে হতে পারে মরুভূমির গরমে সেগুলো অসুবিধার কারণ হবে। যেমন, তাদের ঘন পশম কিংবা শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে দেওয়ার ক্ষমতা। অথচ এই বৈশিষ্ট্যগুলোই শরীরের পানি সাশ্রয় করতে এবং প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন