উদ্ভিদ

সহজে যত্ন: ইনডোর প্ল্যান্ট

পড়ার জন্য ধন্যবাদ! কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরের গাছের প্রতিদিন যত্ন নেওয়া, নিয়মিত পাতায় জল স্প্রে করা এবং নির্দিষ্ট আলোর পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে এমন কিছু গাছও রয়েছে, যেগুলোর দিকে দুই সপ্তাহ নজর না দিলেও সেগুলো সহজেই টিকে থাকে, এমনকি নতুন পাতাও গজায়।
আপনি যদি প্রায়ই ভ্রমণে থাকেন, কাজের চাপে ব্যস্ত সময় কাটান কিংবা মাঝেমধ্যে গাছে জল দেওয়ার কথা ভুলে যান, তাহলে এই ১০টি গাছ আপনার ঘরের তাকে বা কোণে রাখার জন্য চমৎকার পছন্দ হতে পারে।

স্নেক প্ল্যান্ট (Snake Plant) দিয়ে শুরু করুন

স্নেক প্ল্যান্ট এমন একটি সহনশীল গাছ, যা দীর্ঘ সময় বিশেষ যত্ন ছাড়াই টিকে থাকতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশে এটি প্রায় এক মাস জল না পেলেও বেঁচে থাকতে পারে। এর মোটা, খাড়া পাতায় জল সঞ্চিত থাকে, তাই অতিরিক্ত ভেজা মাটির তুলনায় শুকনো মাটিতে এটি ভালো থাকে। এই গাছের যত্নে সবচেয়ে বড় ভুল হলো ঘন ঘন জল দেওয়া, কারণ এতে গোড়া পচে যেতে পারে।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে তিন সপ্তাহ অন্তর জল দিন; শীতকালে আরও কম জল প্রয়োজন হতে পারে। গাছটি এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে সরাসরি কড়া রোদ পড়ে না। অন্ধকার কোণেও এটি টিকে থাকতে পারে, তবে জানালার কাছে উজ্জ্বল পরোক্ষ আলো পেলে তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে।

পোথোস (Pothos) প্রায় সব পরিবেশেই মানিয়ে নেয়

পোথোস ‘ডেভিলস আইভি’ (devil’s ivy) নামেও পরিচিত। এই গাছ সহজেই শিকড় গজাতে পারে এবং গভীর ছায়া ছাড়া বিভিন্ন ধরনের আলোর পরিবেশে মানিয়ে নিতে সক্ষম। অফিস ও কর্মস্থলে এটি বেশ জনপ্রিয়, কারণ মাঝেমধ্যে জল দিতে ভুলে গেলেও গাছটি সাধারণত সহজে নষ্ট হয় না।
প্রতিবার জল দেওয়ার আগে মাটিকে শুকিয়ে যেতে দিন এবং লতাগুলো অতিরিক্ত লম্বা হয়ে গেলে ছেঁটে নিন। গাছের একটি ডাল কেটে পানিতে ডুবিয়ে রাখলে সাধারণত কিছুদিনের মধ্যেই শিকড় গজাতে শুরু করে। উপযুক্ত পরিবেশে প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন শিকড় দেখা যেতে পারে।

জেডজেড প্ল্যান্ট (ZZ Plant) কম আলোতেও দিব্যি থাকে

জেডজেড প্ল্যান্টের মাটির নিচে মোটা রাইজোম বা কন্দের মতো অংশ থাকে, যা জল সঞ্চয় করতে সাহায্য করে। এ কারণেই দীর্ঘ সময় জল না পেলেও গাছটি বেঁচে থাকতে পারে। এটি অল্প আলো সহ্য করতে পারে এবং জানালাবিহীন ঘরেও কিছু সময় টিকে থাকতে পারে। তবে পর্যাপ্ত আলো না থাকলে এর বৃদ্ধির গতি অনেকটাই কমে যায়।
সাধারণত প্রতি তিন থেকে চার সপ্তাহ অন্তর জল দেওয়া যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময় মেনে জল দেওয়ার পরিবর্তে মাটির শুষ্কতা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো। গাছের পাতা হলুদ হয়ে গেলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জল দেওয়া হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও শিকড় পচে যাওয়ার কারণে অনেক সময় এমন সমস্যা দেখা দেয়।

অ্যালোভেরা (Aloe Vera) বা ঘৃতকুমারী—উজ্জ্বল আলোই যার পছন্দ

অ্যালোভেরা এক ধরনের সাকুলেন্ট বা রসালো উদ্ভিদ, যার পাতার ভেতরে জল জমা থাকে। এই ধরনের গাছের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যত্ন, বিশেষ করে ঘন ঘন জল দেওয়ার কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। গাছটি সক্রিয়ভাবে বাড়ার সময়ে সাধারণত প্রতি দুই থেকে তিন সপ্তাহ অন্তর জল দেওয়া যায়। শীতকালে বৃদ্ধি কমে গেলে মাসে একবার বা তারও কম জল প্রয়োজন হতে পারে।
অ্যালোভেরা প্রচুর আলো পছন্দ করে। দক্ষিণমুখী জানালার কাছে পর্যাপ্ত আলো পেলে এটি ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। তবে হঠাৎ তীব্র সরাসরি রোদে রাখলে পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এর পাতার ভেতরের জেল ত্বক প্রশমিত করতে ব্যবহার করা হয়। তবে পোড়া বা আঘাতের চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গুরুতর পোড়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গাছের গোড়ায় ছোট চারা গজালে সেগুলো আলাদা টবে লাগিয়ে নতুন গাছ তৈরি করতে পারেন।

পিস লিলি (Peace Lily) নিজেই জানিয়ে দেয় কখন জল প্রয়োজন

পিস লিলির জল প্রয়োজন হলে এর পাতাগুলো নুয়ে পড়ে। জল দেওয়ার পর উপযুক্ত পরিবেশে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাতাগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠতে পারে। এই দৃশ্যমান সংকেতের কারণে গাছটির পানির চাহিদা বোঝা তুলনামূলক সহজ। তবে বারবার গাছটিকে অতিরিক্ত শুকিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
পিস লিলি মাঝারি মাত্রার উজ্জ্বল পরোক্ষ আলো পছন্দ করে। বিকেলের তীব্র সরাসরি সূর্যের আলোয় এর পাতা পুড়ে যেতে পারে। আপনার এলাকার কলের পানিতে অতিরিক্ত খনিজ বা রাসায়নিকের প্রভাব থাকলে পাতার ডগা বাদামি হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত বিকল্প পানি ব্যবহার করে দেখতে পারেন। মনে রাখবেন, পাতার ডগা বাদামি হওয়ার পেছনে পানির গুণমান, আর্দ্রতা এবং অন্যান্য পরিচর্যাজনিত কারণও থাকতে পারে।

কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট (Cast Iron Plant) সত্যিই অত্যন্ত সহনশীল

কাস্ট আয়রন প্ল্যান্টের বৈজ্ঞানিক নাম Aspidistra elatior। প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে গাছটি এই নাম পেয়েছে। অল্প আলো, শুষ্ক ঘরের বাতাস এবং অনিয়মিত জল দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও এটি অনেক সময় সহ্য করতে পারে। গাছটি ধীরে বাড়ে বলে বছরের পর বছর তুলনামূলক ছোট ও সুসংহত আকারে থাকতে পারে।
মাটির উপরিভাগের প্রায় এক ইঞ্চি অংশ শুকিয়ে গেলে জল দিন। গাছটিকে সরাসরি তীব্র সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখুন। পাতার ডগা বাদামি হয়ে গেলে শুধু পানির অভাবকেই দায়ী করবেন না; বাতাসের শুষ্কতা, পানির গুণমান কিংবা অন্যান্য পরিচর্যাজনিত কারণও পরীক্ষা করে দেখুন।

স্পাইডার প্ল্যান্ট (Spider Plant) থেকে তৈরি করুন আরও অনেক গাছ

স্পাইডার প্ল্যান্টের লম্বা ডগায় ছোট ছোট চারা জন্মায়। উপযুক্ত পরিবেশে এই চারাগুলো মাটি কিংবা পানিতে শিকড় গজাতে পারে। ফলে একটি গাছ থেকেই সহজে আরও কয়েকটি নতুন গাছ তৈরি করা সম্ভব।
এটি বিভিন্ন ধরনের আলোর পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে এবং অল্প সময় জল না পেলেও অনেক ক্ষেত্রে আবার সতেজ হয়ে ওঠে। সাধারণত প্রতি এক থেকে দুই সপ্তাহ অন্তর জল দেওয়া যেতে পারে। তবে পরবর্তীবার জল দেওয়ার আগে মাটি কিছুটা শুকিয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
কলের পানিতে থাকা ফ্লোরাইড পাতার ডগা বাদামি করে দিতে পারে। এমন সমস্যা দেখা দিলে সম্ভব হলে বৃষ্টির পানি বা উপযুক্ত বিকল্প পানি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

জেড প্ল্যান্ট (Jade Plant) পাতার ভেতরেই জমিয়ে রাখে জল

জেড প্ল্যান্টের মোটা ও রসালো পাতাগুলো শুধু দেখতে সুন্দর নয়, এগুলো জল সঞ্চয় করতেও সাহায্য করে। তাই গাছটিকে ঘন ঘন জল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে জল দিন এবং টবের অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে দিন। পরবর্তীবার জল দেওয়ার আগে মাটি পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সাধারণত প্রতি দুই থেকে তিন সপ্তাহ অন্তর জল দিলেই চলে, যদিও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এই ব্যবধান বদলাতে পারে।
উজ্জ্বল আলোতে রাখলে গাছটির কাণ্ড ধীরে ধীরে কাঠের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। তবে ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি প্রবাহ এবং অতিরিক্ত ভেজা মাটি এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে শীতল পরিবেশে মাটি দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

কম আলোযুক্ত ঘরের জন্য চাইনিজ এভারগ্রিন (Chinese Evergreen)

চাইনিজ এভারগ্রিনের বৈজ্ঞানিক নাম Aglaonema। এটি অন্যান্য অনেক পাতাবহুল গাছের তুলনায় কম আলোতে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর জন্য ঘন ঘন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। সাধারণত প্রতি এক থেকে দুই সপ্তাহ অন্তর জল দেওয়া যেতে পারে, তবে তার আগে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করে নিন।
পাতায় বিভিন্ন রঙের ছোপ বা নকশা থাকা জাতগুলোর রং সুন্দর রাখতে তুলনামূলক বেশি উজ্জ্বল পরোক্ষ আলোর প্রয়োজন হতে পারে। ছোট জানালা রয়েছে এমন ঘরেও গাছটি মানিয়ে নিতে পারে। তবে জানালাবিহীন ঘরে দীর্ঘদিন রাখলে পর্যাপ্ত কৃত্রিম আলো নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাইনিজ এভারগ্রিন পোষা প্রাণীর জন্য বিষাক্ত হতে পারে। বাড়িতে বিড়াল, কুকুর বা ছোট শিশু থাকলে গাছটি তাদের নাগালের বাইরে রাখুন।

রাবার প্ল্যান্ট (Rubber Plant) অল্প যত্নেই হয়ে ওঠে ঘরের আকর্ষণ

রাবার প্ল্যান্টের বৈজ্ঞানিক নাম Ficus elastica। সঠিক পরিবেশে এই গাছ ঘরের ভেতর বেশ লম্বা হয়ে উঠতে পারে। এর বড়, চকচকে পাতাগুলো ঘরের সাজে আলাদা আকর্ষণ যোগ করে। মাটির উপরিভাগের প্রায় এক ইঞ্চি অংশ শুকিয়ে গেলে জল দিন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি দুই থেকে তিন সপ্তাহ অন্তর জল প্রয়োজন হতে পারে, তবে ঋতু, আলো ও ঘরের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে এই ব্যবধান বদলাতে পারে।
মাঝেমধ্যে পাতাগুলো নরম কাপড় দিয়ে মুছে দিন, যাতে ধুলো জমে আলোর প্রবেশে বাধা সৃষ্টি না করে। গাছটি উজ্জ্বল কিন্তু পরোক্ষ আলোতে ভালো থাকে। একবার উপযুক্ত জায়গা বেছে নিলে বারবার স্থান পরিবর্তন না করাই ভালো, কারণ পরিবেশের ঘন ঘন পরিবর্তনে এর বৃদ্ধি প্রভাবিত হতে পারে।
রাবার প্ল্যান্টের যত্নে সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত জল দেওয়া। তাই জল দেওয়ার আগে আঙুল দিয়ে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করুন। মাটি এখনও ভেজা থাকলে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করুন। গাছটির দুধের মতো রস ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে, তাই ছাঁটাইয়ের সময় সতর্ক থাকুন এবং শিশু ও পোষা প্রাণীর নাগালের বাইরে রাখুন।

কম যত্নে গাছ সতেজ রাখার সহজ কৌশল

এই গাছগুলোর মধ্যে যেটিই বেছে নিন না কেন, কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললে পরিচর্যা অনেক সহজ হয়ে যাবে। প্রথমত, নির্দিষ্ট দিন ধরে জল দেওয়ার পরিবর্তে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করুন। একই গাছের পানির চাহিদা ঋতু, তাপমাত্রা, আলোর পরিমাণ ও টবের আকার অনুযায়ী বদলাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, টবের নিচে পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকা নিশ্চিত করুন। জল দেওয়ার পর অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে দিন এবং টবের নিচে জমে থাকা পানি ফেলে দিন। তৃতীয়ত, গাছের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত আলোর ব্যবস্থা করুন। কম আলো সহ্য করতে পারে এমন গাছেরও বেঁচে থাকা ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য কিছুটা আলো প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতিরিক্ত জল দেওয়ার চেয়ে মাটির অবস্থা বুঝে জল দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। একটি গাছ দিয়ে শুরু করুন, তার বৃদ্ধি ও পানির চাহিদা পর্যবেক্ষণ করুন, তারপর ধীরে ধীরে ঘরের সবুজ সংগ্রহ বাড়িয়ে তুলুন। ব্যস্ত জীবনেও এভাবেই অল্প যত্নে ঘরকে সতেজ, সবুজ ও প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন