প্রাণী

আধিপত্যের অজানা রহস্য!

প্রিয় পাঠক! অনেক প্রাণীর সামাজিক জীবন অনেকটা এমন একটি ছোট রান্নাঘরের মতো, যেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষ কাজ করে। সেখানে কেউ আগে খাবার বেছে নেয়, কেউ নিজের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, আবার কেউ ঝামেলা এড়িয়ে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
প্রাণীদের সমাজেও ঠিক এমন একটি ব্যবস্থা দেখা যায়, যার নাম ‘আধিপত্যের সোপানক্রম’ (dominance hierarchy)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণীরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে।
যেমন—কে সবার আগে খাবার পাবে, কে সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গায় বিশ্রাম নেবে কিংবা দলের সীমিত সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার অগ্রাধিকার থাকবে।
যখন একই দলের সদস্যরা বারবার একে অপরের সংস্পর্শে আসে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে অনুমানযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন এই আধিপত্যের সোপানক্রম গড়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে প্রাণীরা এমন একটি সামাজিক ক্রমবিন্যাস তৈরি করে নেয়, যেখানে কেউ অন্য কারও তুলনায় উচ্চ অবস্থানে থাকে। আবার সেই প্রাণীটিও দলের অন্য কোনো সদস্যের চেয়ে উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা কমাতে সাহায্য করে। কারণ, কোনো মূল্যবান সম্পদ সামনে এলেই দলের সদস্যদের বারবার লড়াই করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয় না। বিষয়টি অনেকটা অলিখিত ‘আসন বিন্যাস’ বা সিটিং চার্টের মতো, যা দলের প্রত্যেক সদস্য কোনো না কোনোভাবে বুঝে নেয় এবং মনে রাখে।

আধিপত্যের সোপানক্রম আসলে কী?

আধিপত্যের সোপানক্রম হলো এক ধরনের সামাজিক সংগঠন, যেখানে দলের প্রতিটি সদস্যকে অন্য সদস্যদের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে (rank) রাখা হয়। উচ্চ অবস্থানে থাকা প্রাণীরা খাবার, সঙ্গী কিংবা বাসস্থানের মতো সম্পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত অগ্রাধিকার পায়। অন্যদিকে, নিম্ন অবস্থানে থাকা প্রাণীরা প্রায়ই তাদের পথ ছেড়ে দেয়।
এই সম্পর্ক কখনো সরলরৈখিক হতে পারে। যেমন—‘ক’ রয়েছে ‘খ’-এর ওপরে, আর ‘খ’ রয়েছে ‘গ’-এর ওপরে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে এবং সব সদস্যের অবস্থানকে সহজে একটি সরল রেখায় সাজানো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে মূল ধারণাটি একই: বারবার সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এমন একটি শৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা দলের সদস্যরা বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করে।

প্রাণীদের সামাজিক অবস্থান বা র‍্যাঙ্ক কীভাবে নির্ধারিত হয়?

সাধারণত বারবার প্রতিযোগিতা, শারীরিক ভঙ্গি প্রদর্শন, সংকেত আদান-প্রদান এবং দৈনন্দিন মেলামেশার মধ্য দিয়ে প্রাণীদের সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে শারীরিক আকার, শক্তি, বয়স, অভিজ্ঞতা কিংবা অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিত্রতা নির্ধারণ করে দেয় কে দলের সবচেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকবে। আবার অন্য কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক সক্ষমতাই নয়, পারিবারিক বংশমর্যাদা ও সামাজিক সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একবার এই সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, প্রাণীরা শারীরিক ভঙ্গি, নড়াচড়া, বিশেষ শব্দ কিংবা নতিস্বীকারমূলক আচরণের মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখে। অর্থাৎ, এই সোপানক্রম টিকিয়ে রাখতে সবসময় সরাসরি সংঘাতের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় নিজের অবস্থান সম্পর্কে সামান্য ইঙ্গিত দিলেই অন্য প্রাণীরা বুঝে যায় কী করতে হবে।
বিষয়টি অনেকটা শ্রেণিকক্ষে শেষ খাবারটি নেওয়ার পরিস্থিতির মতো। কোনো সহপাঠী খাবারটির দিকে হাত বাড়ালে অন্যরা হয়তো চুপচাপ মেনে নেয় যে, সেটি নিয়ে ঝগড়া করার কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রাণীরা কেন আধিপত্যের এই ব্যবস্থা অনুসরণ করে?

আধিপত্যের সোপানক্রমের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এটি বারবার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ার কারণে ব্যয় হওয়া শক্তি ও সময় কমিয়ে আনে। দলের সদস্যরা যখন আগে থেকেই নিজেদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত থাকে, তখন তাদের অনবরত একে অপরকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রয়োজন পড়ে না। এর ফলে শক্তি সাশ্রয় হয় এবং আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়।
এই ক্রমবিন্যাস সীমিত সম্পদের প্রাপ্যতাকেও অনেক বেশি অনুমানযোগ্য করে তোলে। উচ্চ অবস্থানে থাকা প্রাণীরা সাধারণত সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পায়। অন্যদিকে, নিম্ন অবস্থানে থাকা প্রাণীদের অপেক্ষা করতে হয়, সরে দাঁড়াতে হয় অথবা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিকল্প কৌশল অবলম্বন করতে হয়।
ব্যবস্থাটি শুনতে কিছুটা অন্যায্য মনে হতে পারে। সত্যি বলতে, প্রকৃতি সবসময় সবাইকে সমান সুযোগ বা পুরস্কার দেয় না। তবুও এই সামাজিক কাঠামো প্রাণীদের বারবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে এবং দলকে তুলনামূলক সুশৃঙ্খলভাবে চলতে সাহায্য করে।

প্রজাতিভেদে আধিপত্যের সোপানক্রমের ধরন কেন আলাদা?

উদাহরণ হিসেবে নেকড়েদের কথা ধরা যাক। একটি নেকড়ের দলে প্রজননকারী জোড়া নেতৃত্ব দিতে পারে। দলের অন্য সদস্যরা তাদের শারীরিক ভঙ্গি, গর্জন কিংবা লেজের অবস্থানের মতো সংকেত থেকে নিজেদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পায়।
মুরগির মধ্যে দেখা যায় পরিচিত ‘পেকিং অর্ডার’ (pecking order) বা ঠোকর দেওয়ার ক্রম। এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রভাবশালী মুরগিটি সাধারণত সবার আগে খাবার খায়। অন্য কোনো মুরগি তাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করলে, সে ঠোকর দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতে পারে।
শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে জোট গঠন এবং একে অপরের শরীর পরিষ্কার করে দেওয়ার (grooming) মতো সামাজিক আচরণ তাদের অবস্থান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি কখনো কখনো তারা জোটবদ্ধ হয়ে প্রভাবশালী পুরুষ শিম্পাঞ্জিকেও ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।
মৌমাছির কলোনিতে রানি মৌমাছি প্রজননের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, আর কর্মী মৌমাছিরা বয়স ও দায়িত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজ ভাগ করে নেয়। প্রতিটি প্রজাতি এই মৌলিক সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে আলাদা ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, মাছ এবং কীটপতঙ্গসহ অসংখ্য প্রাণীর মধ্যে আধিপত্যভিত্তিক সামাজিক ক্রমবিন্যাস দেখা যায়। কিছু দলে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্থিতিশীল থাকে। অন্যদিকে, কিছু দলের সদস্যদের অবস্থান ঋতু, বয়স, প্রজনন অবস্থা, দলের আকার কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে সদস্যদের সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য খুব স্পষ্ট, আবার অন্যদের মধ্যে তা বেশ নমনীয়। এমন কিছু ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে বংশানুক্রমে সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে যেসব সামাজিক প্রাণীর জীবনে পারিবারিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, মূল ধারণাটি একই হলেও প্রতিটি প্রজাতির সামাজিক কাঠামো নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে গড়ে ওঠে।

সামাজিক সংকেত, নতিস্বীকার ও স্মৃতি কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখে?

একটি সামাজিক ক্রমবিন্যাস কার্যকর রাখতে প্রাণীদের একে অপরের অবস্থান শনাক্ত করতে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হতে হয়। এ জন্য তারা প্রায়ই বিভিন্ন সামাজিক সংকেত ব্যবহার করে। প্রভাবশালী প্রাণীরা শারীরিক ভঙ্গি ও আচরণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস কিংবা কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে পারে। অন্যদিকে, নিম্ন অবস্থানে থাকা প্রাণীরা চোখে চোখ রাখা এড়িয়ে চলে, সরে দাঁড়ায়, শরীর গুটিয়ে রাখে অথবা শান্ত করার উদ্দেশ্যে বিশেষ সংকেত (appeasing signals) প্রদর্শন করে।
দলের সদস্যদের মধ্যে ‘সামাজিক স্মৃতি’ থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুরো ব্যবস্থাটিই অনেকাংশে নির্ভর করে কে কার চেয়ে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, তা মনে রাখার ওপর। এই স্মৃতি না থাকলে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। পরিস্থিতি তখন অনেকটা ঝাঁকুনিতে প্যানকেকের স্তূপ ভেঙে পড়ার মতো হয়ে যেত—গোছানো কাঠামোটি দ্রুত এলোমেলো হয়ে পড়ত।

আধিপত্যের সোপানক্রম কি চিরস্থায়ী?

যদিও কোনো দলের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস বা অনুক্রম (hierarchy) দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে তা সবসময় স্থায়ী হয় না। কোনো প্রাণীর বয়স বাড়লে, নতুন মিত্র তৈরি হলে, শারীরিক সক্ষমতা কমে গেলে কিংবা নতুন কোনো দলে যোগ দিলে তার সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। কখনো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর চ্যালেঞ্জ সফল হয়, আবার কখনো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের সামাজিক ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলে যায়।
কিছু প্রজাতির সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস অত্যন্ত কঠোর, আবার কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে তা নমনীয় এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তাই সামাজিক মর্যাদাকে কোনো প্রাণীর গায়ে সারা জীবনের জন্য সেঁটে দেওয়া স্থায়ী তকমা হিসেবে দেখার পরিবর্তে, পরিবর্তনশীল একটি সম্পর্ক হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
সব মিলিয়ে, প্রাণীরা বারবার মিথস্ক্রিয়া, একে অপরকে চিনে রাখা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংকেত ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে মর্যাদাগত সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্কগুলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যা সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রকৃতির এই ব্যবস্থা সবসময় সমতাভিত্তিক বা সহজ নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এটি দলগত জীবনকে সুশৃঙ্খল রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
তাই পরের বার যখন কোনো প্রাণীর দলকে পর্যবেক্ষণ করবেন, তখন শুধু কারা সেখানে উপস্থিত রয়েছে, সেদিকে নজর দেবেন না। বরং খেয়াল করুন, কে অন্যদের জন্য পথ ছেড়ে দিচ্ছে, কে সবার আগে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কীভাবে প্রত্যেকটি প্রাণী যেন আগে থেকেই জানে তার কী করা উচিত। এই ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে প্রাণীদের সামাজিক জীবনের এক বিস্ময়কর রহস্য!

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন