প্রাণী
বিড়াল রোদ পোহাতে ভালোবাসে
অনেক বিড়ালপ্রেমীর কাছেই দৃশ্যটি বেশ পরিচিত। মেঝে, সোফা কিংবা জানালার ধারে এক টুকরো রোদ এসে পড়তেই কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে হাজির হয় পোষা বিড়ালটি।
কখনো সে আরাম করে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে, কখনো গুটিসুটি মেরে বসে থাকে, আবার কখনো চোখ বন্ধ করে উষ্ণতা উপভোগ করে। কিন্তু বিড়াল কেন রোদে বসতে এত পছন্দ করে?
এর পেছনে শুধু আরাম করে বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছাই কাজ করে না। শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা, দীর্ঘ সময় ঘুমানোর অভ্যাস, সহজাত প্রবৃত্তি এবং পরিচিত পরিবেশে স্বস্তি খুঁজে পাওয়ার মতো বিষয়গুলোও বিড়ালের এই আচরণের সঙ্গে জড়িত।
উষ্ণতার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ
বিড়ালের রোদ পোহানোর অন্যতম প্রধান কারণ হলো উষ্ণতা। মানুষের তুলনায় বিড়ালের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি। সাধারণত একটি সুস্থ বিড়ালের শরীরের তাপমাত্রা ১০০.০ থেকে ১০২.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৭.৭ থেকে ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত হতে পারে। আরামদায়ক উষ্ণ পরিবেশে থাকলে তাদের শরীরের তাপ ধরে রাখতে সুবিধা হয়।
সূর্যের আলো তাপ পাওয়ার একটি সহজ প্রাকৃতিক উৎস। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেওয়ার সময় উষ্ণ জায়গা বিড়ালের কাছে বেশ আরামদায়ক হয়ে ওঠে। বিড়াল দিনের বড় একটি অংশ ঘুমিয়ে বা বিশ্রাম নিয়ে কাটায়। তাই রোদে গা এলিয়ে থাকার সুযোগ পেলে তারা স্বাভাবিকভাবেই সেই জায়গার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে।
এ কারণেই দিনের বিভিন্ন সময়ে বিড়ালকে এক উষ্ণ জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যেতে দেখা যায়। সকালে মেঝেতে যেখানে রোদ পড়ে, দুপুরে সেখানে আর আলো না থাকলে সে হয়তো জানালার পাশে গিয়ে বসবে। আবার বিকেলে অন্য কোনো জায়গায় রোদ পড়লে সেটিকেও বিশ্রামের জন্য বেছে নিতে পারে।
দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সময় উষ্ণতা কেন প্রয়োজন?
বিড়ালের ঘুমের অভ্যাসও রোদ পোহানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা যখন দীর্ঘ সময় ধরে স্থির হয়ে শুয়ে থাকে, তখন শরীরের শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ চলাফেরা বা খেলাধুলার সময়ের তুলনায় কম থাকে। এ সময় উষ্ণ পরিবেশ শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
এ কারণেই কোনো বিড়ালকে রোদে ভরা মেঝেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরাম করে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে শুধু সূর্যের আলোই নয়, উষ্ণ কম্বল, নরম বিছানা কিংবা আরামদায়ক কোনো কোণও তাদের কাছে সমান আকর্ষণীয় হতে পারে।
অর্থাৎ, বিড়ালের কাছে মূল আকর্ষণ হলো আরামদায়ক উষ্ণতা। সূর্যের আলো সেই উষ্ণতা পাওয়ার একটি সহজ উপায় মাত্র। তবে অতিরিক্ত গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকা তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই রোদে শুয়ে থাকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য জায়গায় সরে যাওয়ার স্বাধীনতাও থাকা জরুরি।

বিড়ালের সহজাত প্রবৃত্তিও কি এর পেছনে কাজ করে?
গৃহপালিত বিড়ালের আচরণের সঙ্গে তার বিবর্তনীয় ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। বিড়ালের বন্য পূর্বপুরুষদের জীবনযাপনে পরিবেশের তাপমাত্রা অনুযায়ী বিশ্রামের জায়গা বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আধুনিক গৃহপালিত বিড়াল নিরাপদ ঘরে বসবাস করলেও তাদের মধ্যে উষ্ণ ও আরামদায়ক জায়গা খোঁজার প্রবণতা এখনো দেখা যায়।
সূর্যের আলো পড়া একটি জায়গায় একই সঙ্গে উষ্ণতা, বিশ্রামের সুযোগ এবং চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। ফলে এমন জায়গা বিড়ালের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
তবে সব বিড়ালের পছন্দ এক রকম নয়। কোনো বিড়াল জানালার পাশে রোদ পোহাতে ভালোবাসে, আবার কোনোটি ছায়াযুক্ত বিছানা কিংবা ঘরের নিরিবিলি কোণে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বয়স, ব্যক্তিগত স্বভাব এবং পরিবেশের ওপর নির্ভর করে তাদের পছন্দেরও পরিবর্তন হতে পারে।
রোদে বসলে বিড়াল কি মানসিক প্রশান্তি পায়?
বিড়ালের রোদ পোহানোর পেছনে আরাম ও পরিচিত পরিবেশের প্রতিও আকর্ষণ কাজ করতে পারে। কোনো বিড়াল যদি প্রতিদিন একই জায়গায় গিয়ে ঘুমায়, তাহলে ধীরে ধীরে সেই স্থানটি তার দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বিড়াল সাধারণত বিশ্রামের জায়গা বেছে নেওয়ার সময় উষ্ণতা, আরাম, নিরাপত্তা এবং চারপাশের পরিবেশ বিবেচনা করে। জানালার পাশে রোদ পড়া একটি জায়গায় এসব সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া গেলে সেটি তার পছন্দের স্থান হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া পরিচিত জায়গায় নিরিবিলিতে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ বিড়ালকে স্বস্তি পেতে সাহায্য করতে পারে। তবে রোদে বসে থাকার অর্থ সব সময় মানসিক প্রশান্তি বা সুখের নির্দিষ্ট প্রমাণ নয়। বিড়ালের সামগ্রিক আচরণ, শরীরী ভাষা এবং পরিবেশের সঙ্গে তার স্বাচ্ছন্দ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিড়াল কি রোদ থেকে ভিটামিন ডি পায়?
অনেকের ধারণা, মানুষের মতো বিড়ালও সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি আলাদা। বিড়ালের ত্বক সূর্যের আলো ব্যবহার করে মানুষের মতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে না। তাদের শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি মূলত খাবার থেকেই আসে।
তাই বিড়ালকে রোদে বসে থাকতে দেখলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে সে ভিটামিন ডি তৈরির জন্যই রোদ পোহাচ্ছে। বরং উষ্ণতা উপভোগ করা, আরাম করে বিশ্রাম নেওয়া এবং পছন্দের জায়গায় সময় কাটানোই এর সম্ভাব্য প্রধান কারণ।
বিড়ালকে রোদ পোহাতে দেওয়া স্বাভাবিক এবং আনন্দদায়ক হতে পারে, তবে তার নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে গরমের দিনে জানালার পাশে বা বারান্দায় অতিরিক্ত তাপ জমে গেলে বিড়ালের শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। তাই এমন ব্যবস্থা রাখুন, যাতে সে চাইলে সহজেই ছায়াযুক্ত ও ঠান্ডা জায়গায় চলে যেতে পারে।
পাশাপাশি সব সময় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখুন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কড়া রোদে আটকে রাখবেন না। জানালার পাশে বসার সুযোগ দিলে জানালাটি নিরাপদ কি না, সেটিও নিশ্চিত করুন।
সব মিলিয়ে, বিড়ালের রোদ পোহানোর অভ্যাসের পেছনে রয়েছে উষ্ণতার চাহিদা, বিশ্রামের স্বভাব এবং আরামদায়ক পরিবেশের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ। তাই আপনার পোষা বিড়ালটি যখন রোদে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে, তখন তাকে সেই আরাম উপভোগ করতে দিতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখুন, যেন সে প্রয়োজনমতো ছায়া, বিশুদ্ধ পানি এবং অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পায়। তাহলেই তার প্রিয় রোদেলা সময় কাটবে আরও স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদভাবে।