উদ্ভিদ
ছোট বারান্দার গাছপালা
প্রিয় পাঠক, ছোট বারান্দায় একটু একটু করে গাছ লাগাতে লাগাতে কখন যে পুরো মেঝে টবে ভরে যায়, তা অনেক সময় খেয়ালই থাকে না। একসময় গাছে জল দেওয়াও ঝামেলার কাজ হয়ে দাঁড়ায়, আর বারান্দাটি দেখায় অগোছালো।
তবে বারান্দাকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সুপরিকল্পিত করে তুলতে বাড়তি জায়গার প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু কিছু সহজ কৌশল, সামান্য পরিকল্পনা এবং নিয়মিত যত্ন।
প্রথমে একটি মূল রঙ বেছে নিন
টেরাকোটা, ম্যাট ব্ল্যাক (অনুজ্জ্বল কালো), গ্লেজড সাদা কিংবা কংক্রিটের ধূসর—এই রংগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে অধিকাংশ টব সেই রঙের রাখুন। বারান্দায় বিভিন্ন রঙ ও নকশার ১২টি টব থাকলে গাছগুলো সুস্থ হলেও পুরো জায়গাটি অগোছালো মনে হতে পারে। অন্যদিকে, একই ১২টি টবের রং বা ফিনিশ একরকম হলে পুরো বিন্যাসে আসবে পরিপাটি ও নান্দনিক ভাব।
আপনার কাছে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের টব থাকলে বেমানান টবগুলো রং করে নিতে পারেন অথবা অন্য টবের আড়ালে সাজিয়ে রাখতে পারেন। চাইলে মূল রঙের সঙ্গে মানানসই একটি অ্যাকসেন্ট রংও ব্যবহার করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত রঙের ব্যবহার এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে বারান্দার সাজসজ্জায় বিশৃঙ্খল ভাব তৈরি হতে পারে।
সারিবদ্ধভাবে না সাজিয়ে গুচ্ছাকারে রাখুন
বারান্দার রেলিংয়ের পাশে একটির পর একটি টব সারিবদ্ধভাবে রাখলে জায়গাটি অনেকটা অপেক্ষাকক্ষের মতো দেখাতে পারে। এর পরিবর্তে টবগুলো কয়েকটি ছোট গুচ্ছে সাজিয়ে রাখুন। প্রতিটি গুচ্ছের পেছনে একটি লম্বা গাছ, পাশে মাঝারি উচ্চতার গাছ এবং সামনে ছোট বা লতানো গাছ রাখলে তৈরি হবে সুন্দর স্তরবিন্যাস।
সাধারণত ৩, ৫ বা অন্য কোনো বিজোড় সংখ্যায় গাছ সাজালে বিন্যাসটি দেখতে বেশি স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় লাগে। এতে চোখ আলাদা করে প্রতিটি টবের দিকে না গিয়ে পুরো গুচ্ছটির ওপর পড়ে। প্রায় ৩ বর্গমিটার আয়তনের ছোট বারান্দার জন্য দুই বা তিনটি গুচ্ছই যথেষ্ট। এর বেশি গুচ্ছ তৈরি করলে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
মেঝের বদলে উচ্চতাকে কাজে লাগান
ছোট বারান্দায় মেঝের জায়গা সীমিত থাকে। তাই সব টব মেঝেতে না রেখে দেয়াল ও ওপরের খালি জায়গা কাজে লাগান। দেয়ালে দুই স্তরের কাঠের তাক বসাতে পারেন। আইভি বা স্ট্রিং অব পার্লসের মতো লতানো গাছের জন্য ঝুলন্ত ব্র্যাকেট ব্যবহার করতে পারেন। আবার রেলিংয়ে ভেষজ গাছ লাগানোর উপযোগী প্ল্যান্টার বক্সও বসানো যায়।
এভাবে গাছগুলো বিভিন্ন উচ্চতায় সাজালে বারান্দা দেখতে আরও আকর্ষণীয় হবে এবং মেঝেতে চেয়ার রাখার মতো প্রয়োজনীয় জায়গাও পাওয়া যাবে। তবে দেয়াল বা রেলিংয়ে কোনো কিছু লাগানোর আগে ভবনের নিয়মাবলি জেনে নিন। অনেক ভবনে রেলিংয়ে টব ঝোলানো বা অতিরিক্ত কিছু আটকানোর ওপর বিধিনিষেধ থাকতে পারে।

গাছের আকার অনুযায়ী টব নির্বাচন করুন
ছোট চারাগাছকে অতিরিক্ত বড় টবে রাখলে সেটি দেখতে বেমানান লাগতে পারে। আবার গাছের শিকড়ের তুলনায় টব খুব ছোট হলে শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং গাছ দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। তাই গাছের আকার ও শিকড়ের বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টব নির্বাচন করুন।
গাছের শিকড় যখন টবের নিচের জল নিষ্কাশনের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে বা ছিদ্রের চারপাশে পেঁচিয়ে যায়, তখন সেটিকে তুলনামূলক বড় টবে স্থানান্তর করার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি টবের নিচে জল বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিদ্র আছে কি না, তা নিশ্চিত করুন। নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে অতিরিক্ত জল জমে শিকড় পচে যেতে পারে।
টবের নিচে সসার বা উপযুক্ত প্লেট রাখলে অতিরিক্ত জল মেঝেতে ছড়িয়ে পড়বে না। তবে সসারে দীর্ঘক্ষণ জল জমিয়ে রাখবেন না, কারণ এতে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে।

চলাচলের জন্য একটি পথ ফাঁকা রাখুন
বারান্দায় স্বচ্ছন্দে চলাচলের জন্য একটি নির্দিষ্ট পথ খালি রাখুন। সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার চওড়া জায়গা হাঁটাচলার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। আপনার বারান্দার আকার অনুযায়ী এই পথটি দরজা থেকে বসার জায়গা বা অন্য প্রয়োজনীয় অংশ পর্যন্ত বাধামুক্ত রাখুন।
বাকি টবগুলো বারান্দার কিনারা ঘেঁষে সাজিয়ে রাখতে পারেন। বারান্দাকে পরিপাটি রাখার ক্ষেত্রে এই সহজ নিয়মটি অত্যন্ত কার্যকর। কারণ, গাছপালা দিয়ে জায়গাটি পূর্ণ থাকলেও যদি কোনো বাধা এড়িয়ে চলতে না হয়, তাহলে পুরো পরিবেশ অনেক বেশি প্রশস্ত, শান্ত ও আরামদায়ক মনে হবে।
নিয়মিত জল দেওয়া ও ছাঁটাই করুন
বারান্দায় অগোছালো ভাব সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয়। শুকনো পাতা, ঝরে পড়া ফুল, খালি টব কিংবা কোণায় পড়ে থাকা পানির পাইপ—এ ধরনের ছোটখাটো বিষয়ই পুরো জায়গার সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে।
প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ মিনিট সময় নিয়ে বারান্দা পরিষ্কার করুন। শুকনো পাতা ও ঝরে যাওয়া ফুল সরিয়ে ফেলুন, প্রয়োজন অনুযায়ী গাছ ছাঁটাই করুন এবং মেঝে পরিষ্কার রাখুন। বাগান করার কাঁচি, ছোট কোদাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম একটি ঢাকনাযুক্ত বাক্সে গুছিয়ে রাখুন। নিয়মিত যত্ন পেলে গাছপালা সুস্থ থাকবে এবং বারান্দাও দেখাবে সতেজ ও পরিচ্ছন্ন।
প্রথমে বারান্দার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কয়েকটি গাছ গুছিয়ে রাখুন এবং হাঁটার জন্য একটি পরিষ্কার পথ তৈরি করুন। এরপর প্রয়োজন ও জায়গার পরিমাণ বিবেচনা করে ধীরে ধীরে আরও গাছ যোগ করুন। বারান্দাকে মনোরম করে তুলতে সেটিকে নার্সারির মতো অসংখ্য গাছে ভরিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই।
একটি মূল রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টব নির্বাচন করুন, বিভিন্ন উচ্চতায় গাছ সাজান এবং দেয়াল ও ওপরের খালি জায়গা কাজে লাগান। একই সঙ্গে চলাচলের পথ খোলা রাখুন এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই কয়েকটি সহজ পরিবর্তনই আপনার ছোট বারান্দাকে আরও গোছানো, আকর্ষণীয় ও আরামদায়ক করে তুলতে পারে। পরের বার বারান্দায় গিয়ে হয়তো আপনিই অবাক হবেন—অল্প জায়গাতেও কত সুন্দর একটি সবুজ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব!