প্রাণী

বন্যপ্রাণী বাড়ি হারাচ্ছে

আরে! একটি পরিবারকে তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দিয়ে কাছাকাছি অন্য কোথাও নতুন ঠিকানা খুঁজে নিতে বলা খুব কমই সহজ হয়।
অথচ নগর সম্প্রসারণের কারণে বন্যপ্রাণীরা প্রতিনিয়ত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে তাদের পরিচিত আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। পার্থক্য হলো, এই প্রাণীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা আপত্তি জানানোর কোনো সুযোগই নেই।
শহর যত দ্রুত বিস্তৃত হয়, তত বেশি বন, জলাভূমি, তৃণভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক এলাকা ভবন, রাস্তা ও অবকাঠামোর জন্য পরিবর্তিত হয়। বাইরে থেকে একটি নতুন এলাকা হয়তো সম্পূর্ণ বসবাসযোগ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বন্যপ্রাণীর কাছে একটি আবাসস্থল শুধু খোলা জমি নয়। সেখানে নির্দিষ্ট খাবার, পানির উৎস, আশ্রয়স্থল, প্রজননের জায়গা এবং নিরাপদ চলাচলের পথ থাকতে হয়।

আসলে প্রথমে কী অদৃশ্য হয়ে যায়?

শহরগুলো যখন বাইরের দিকে প্রসারিত হয়, তখন বন, জলাভূমি এবং তৃণভূমি পরিষ্কার করে সেখানে ভবন, রাস্তা ও সেগুলোকে সংযুক্ত করার অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীরা খাবার খোঁজা, শাবক বড় করা এবং শিকারি বা অন্যান্য বিপদ থেকে লুকিয়ে থাকার জন্য যে নির্দিষ্ট স্থানগুলোর ওপর নির্ভর করে, সেগুলো হারিয়ে যেতে থাকে।
আবাসস্থল ধ্বংস: বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে আবাসস্থল ধ্বংস বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক ক্ষেত্রে পুরো আবাসস্থল একবারে অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং বড় প্রাকৃতিক অঞ্চল ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অংশে ভাগ হয়ে যায়।
এই প্রক্রিয়াকে আবাসস্থল খণ্ডীকরণ বলা হয়। এটি সরাসরি আবাসস্থল হারানোর মতোই গুরুতর হতে পারে। একটি বন হয়তো মানচিত্রে এখনও রয়েছে, কিন্তু তার মাঝখান দিয়ে ব্যস্ত রাস্তা চলে গেলে কিংবা চারপাশে ভবন তৈরি হলে প্রাণীদের জন্য সেই বনের বিভিন্ন অংশে নিরাপদে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে খাবার, সঙ্গী কিংবা আশ্রয়ের সন্ধানে প্রাণীদের এমন সব ফাঁক পাড়ি দিতে হয়, যেগুলো আগে ছিল না। রাস্তা, বেড়া, শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা তাদের চলাচলের স্বাভাবিক পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

স্থানচ্যুত প্রাণীরা আসলে কোথায় গিয়ে পৌঁছায়?

কিছু প্রাণী নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে শহুরে এলাকায় প্রবেশ করে। শিয়াল, হরিণ, কিছু পাখি কিংবা অন্যান্য অভিযোজনক্ষম প্রাণীকে তাই কখনো কখনো শহরতলি, পার্ক বা মানুষের বসতির কাছাকাছি দেখা যায়।
দূর থেকে এটিকে অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার উদাহরণ মনে হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় এটি শহুরে পরিবেশের প্রতি প্রাণীদের প্রকৃত পছন্দের চেয়ে ভালো বিকল্পের অভাবকেই প্রকাশ করে। তাদের পুরোনো আবাসস্থল সংকুচিত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মানুষের বসতির আশপাশে খাবার ও আশ্রয় খোঁজা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের সঙ্গে সংঘাত: বন্যপ্রাণী যখন মানুষের কাছাকাছি চলে আসে, তখন উভয় পক্ষই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। প্রাণীরা আবর্জনা, পোষা প্রাণী বা মানুষের খাদ্যের দিকে আকৃষ্ট হতে পারে, আবার মানুষ ফসলের ক্ষতি, সম্পত্তির ক্ষতি কিংবা প্রাণীর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে।
এই ধরনের সংঘাতের পরিণতিতে অনেক সময় প্রাণীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় কিংবা এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু স্থানান্তরও প্রাণীর জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। নতুন এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার বা আশ্রয় না থাকলে কিংবা সেখানে আগে থেকেই একই প্রজাতির প্রাণী বসবাস করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব প্রজাতি সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারে না: সাধারণ পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করতে পারে এবং বিস্তৃত এলাকায় বসবাস করতে পারে এমন প্রাণীরা পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যেসব প্রজাতির খুব নির্দিষ্ট বাসস্থান, খাবার বা প্রজননস্থল প্রয়োজন, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
আর পরিবর্তনের গতি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে পরিবেশ বদলালে কিছু প্রাণী আচরণ পরিবর্তন করে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু দ্রুত নগর উন্নয়ন সেই অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকুও অনেক ক্ষেত্রে দেয় না।

শহরগুলো কীভাবে হারানো সংযোগ ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে?

বন্যপ্রাণী করিডোর: বন্যপ্রাণী করিডোর হলো সংযুক্ত সবুজ স্থান বা প্রাকৃতিক পথ, যা খণ্ডিত আবাসস্থলের বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রাণীদের নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেয়। নগরায়ণের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আবাসস্থলগুলোকে আবার যুক্ত করার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
একটি প্রাণীর জন্য রাস্তা হয়তো কয়েক মিনিটের পথ, কিন্তু দ্রুতগতির যানবাহনে ভরা ব্যস্ত সড়ক তার জন্য প্রাণঘাতী বাধা হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে নির্দিষ্ট প্রাণীদের চলাচলের জন্য নির্মিত ওভারপাস ও আন্ডারপাস অনেক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসব কাঠামো প্রাণীদের রাস্তার ওপর দিয়ে সরাসরি পার হওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ পথে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এগুলো আগে রাস্তা বা অবকাঠামোর কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আবাসস্থলের অংশগুলোর মধ্যে সংযোগ ফিরিয়ে আনতে পারে।
পরিকল্পনার শুরুতেই সংযোগ: কিছু শহর নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা করার সময়ই বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বিবেচনা করতে শুরু করেছে। এটি পরে সম্পূর্ণ উন্নত এলাকায় নতুন করিডোর তৈরি করার তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
একটি প্রাকৃতিক সংযোগস্থল শুরু থেকেই অক্ষত রাখা সাধারণত উন্নয়ন শেষ হওয়ার পর সেটিকে পুনরায় তৈরি করার চেয়ে সহজ। তাই নগর পরিকল্পনায় সবুজ স্থান, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক করিডোরকে শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা ভবিষ্যতের পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে পারে।

ছোট সবুজ স্থানও কি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে?

শহরের ভেতরে থাকা সবুজ স্থানগুলো সবসময় বিশাল বন হতে হবে এমন নয়। জলাশয়ের পাশে দেশীয় উদ্ভিদ, ছোট পার্ক, গাছপালায় আচ্ছাদিত পথ এবং সবুজ ছাদও বিভিন্ন প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় বা চলাচলের স্থান তৈরি করতে পারে।
পাখি, পোকামাকড় এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য এই ছোট ছোট সবুজ অঞ্চলগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাকা রাস্তা ও ঘন ভবনের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা এমন স্থানগুলো একেকটি ছোট ধাপের মতো কাজ করে, যার মাধ্যমে প্রাণীরা শহুরে পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে।
তবে এসব ছোট উদ্যোগ বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণের বিকল্প নয়। এগুলো বরং বৃহত্তর আবাসস্থল সংরক্ষণ ও সংযোগ রক্ষার পরিপূরক হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর।

শহরতলিতে দেখা বন্যপ্রাণীর আসল গল্প কী?

শহরতলির উঠোনে হঠাৎ কোনো হরিণ, শিয়াল কিংবা অন্য বন্যপ্রাণী দেখা গেলে সেটিকে সবসময় শহুরে জীবনের প্রতি আকর্ষণের গল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেক সময় এর পেছনে রয়েছে আরও নীরব একটি পরিবর্তন—তাদের আগের আবাসস্থল ধীরে ধীরে ছোট হয়ে গেছে বা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়েছে।
তারা হয়তো মানুষের কাছে আসতে চায়নি। বরং মানুষের বসতি তাদের পুরোনো পথের ওপর চলে এসেছে, অথবা খাবার ও আশ্রয়ের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে তারা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আগে তাদের উপস্থিতিই ছিল না।
শেষ পর্যন্ত, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অর্থ শুধু কিছু নির্দিষ্ট প্রাণীকে রক্ষা করা নয়। তাদের খাবারের উৎস, প্রজননস্থল, আশ্রয় এবং নিরাপদ চলাচলের পথও রক্ষা করতে হবে। শহর বাড়তেই পারে, কিন্তু সেই সম্প্রসারণ যদি প্রাকৃতিক সংযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে মুছে দেয়, তাহলে প্রাণীদের জন্য পৃথিবী ক্রমেই ছোট হয়ে আসবে।
তাই ভবিষ্যতের শহর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হতে পারে—মানুষের জন্য নতুন জায়গা তৈরি করার পাশাপাশি আমরা কি বন্যপ্রাণীর জন্য তাদের পুরোনো পথগুলোও রেখে দিচ্ছি? কারণ একটি প্রাণীর শেষ আশ্রয়টি হারিয়ে যাওয়ার পর তাকে নতুন বাড়ি খুঁজে নিতে বলা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা কখনোই ততটা সহজ নয়।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন