প্রাণী
শীতনিদ্রায় প্রাণীর কৌশল
হ্যালো, লাইকার্স! শীতকালে বাড়ির তাপমাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, হিটার প্রায় বন্ধ রাখা এবং বেশিরভাগ ঘর বন্ধ করে দিলে অপ্রয়োজনীয় কয়েক মাসের জ্বালানি খরচ ছাড়াই শরীরের অত্যাবশ্যকীয় তন্ত্রগুলো সচল রাখা যায়।
শীতনিদ্রায় থাকা একটি প্রাণীর শরীরও অনেকটা একই কৌশল অনুসরণ করে। বেঁচে থাকার জন্য যা একান্ত প্রয়োজনীয়, তা ছাড়া শরীরের প্রায় সব কার্যক্রমই ধীর হয়ে যায়।
শরীরের ভেতরে আসলে কী কী ধীর হয়ে যায়
শীতনিদ্রার সময় শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়, হৃদস্পন্দন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অগভীর ও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তনের মাত্রা সত্যিই চমকপ্রদ হতে পারে। একটি মারমট সক্রিয় অবস্থায় প্রতি মিনিটে প্রায় ২০০ বার হৃদস্পন্দন করতে পারে, কিন্তু গভীর শীতনিদ্রার সময় তা প্রতি মিনিটে মাত্র কয়েকবারে নেমে আসতে পারে।
বর্জ্য উৎপাদনও অত্যন্ত ধীর হয়ে যায় বা কিছু সময়ের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর কারণ হলো শরীরের বিভিন্ন তন্ত্র তখন খুব কম শক্তি ব্যবহার করছে এবং খুব কম বিপাকীয় বর্জ্য তৈরি করছে। সামগ্রিকভাবে বিপাকীয় হার স্বাভাবিক মাত্রার একটি ক্ষুদ্র অংশে নেমে আসতে পারে। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি সক্রিয় অবস্থায় এক দিনে ব্যবহৃত শক্তির মাত্র এক শতাংশের কাছাকাছিও হতে পারে।
এই অসাধারণ শক্তি সাশ্রয় আংশিকভাবে সম্ভব হয় শরীরের জ্বালানি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে। প্রাণীটি দ্রুত ব্যবহৃত গ্লুকোজের ওপর কম নির্ভর করে এবং শরীরে সঞ্চিত চর্বির মতো শক্তির ভান্ডার ধীরে ধীরে ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে দীর্ঘ সময় খাবার না খেলেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

কেন প্রাণীটি পুরো সময়টা কেবল অচেতন থাকে না
শীতনিদ্রার সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা পরিবেশের পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য বিপদের প্রতি নজর রাখতে সক্রিয় থাকে।
শীতনিদ্রাও আসলে একটানা গভীর ঘুম নয়। এটি গভীর তন্দ্রার পুনরাবৃত্ত চক্রে বিভক্ত, যার মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত জাগরণের পর্যায় আসে। এই সময় শরীরের তাপমাত্রা অল্প সময়ের জন্য প্রায় স্বাভাবিক মাত্রার দিকে ফিরে আসে। এরপর প্রাণীটি আবার গভীর তন্দ্রায় চলে যায়।
গবেষকরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে এই জাগরণগুলো কেন ঘটে। কারণ শরীরকে আবার উষ্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয় এবং শীতকালীন মোট শক্তির বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রক্রিয়ায় খরচ হতে পারে। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই উষ্ণ সময়গুলোতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে এই বিরতিগুলো শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, কয়েক মাসের নিষ্ক্রিয়তা এবং খুব কম খাবার গ্রহণের পরও অনেক শীতনিদ্রাকারী প্রাণী বসন্তে জেগে উঠে তাদের পেশীর ভর তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে ধরে রাখতে পারে। পেশী সংরক্ষণের এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চলছে, কারণ দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা মানুষের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য চিকিৎসাগত প্রয়োগ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কেন সব প্রাণী একই পদ্ধতি অবলম্বন করে না
কাঠবিড়ালি ও মারমটের মতো কিছু প্রাণী সত্যিকারের গভীর শীতনিদ্রায় প্রবেশ করে। এ সময় তাদের শরীরের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য হিমাঙ্কের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে এবং বিপাকীয় কার্যক্রম অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়।
অন্যদিকে, কালো ভাল্লুক তুলনামূলকভাবে কম গভীর একটি শীতকালীন নিষ্ক্রিয়তার অবস্থায় থাকে, যাকে সাধারণত ডেনিং বলা হয়। তাদের শরীরের তাপমাত্রা গভীর শীতনিদ্রায় থাকা ছোট স্তন্যপায়ীদের মতো অতটা কমে যায় না। এর ফলে তারা শীতের সময় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় থাকতে পারে।
এই পার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিময় রয়েছে। গভীর তন্দ্রা শরীরকে বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে সাহায্য করে, কিন্তু কোনো হুমকির মুখে দ্রুত সক্রিয় হওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত হালকা ডেনিং অবস্থায় প্রাণী কিছুটা বেশি শক্তি ব্যয় করলেও প্রয়োজনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
জলবায়ুও এই কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব অঞ্চলে শীতকাল তুলনামূলকভাবে ছোট ও মৃদু, সেখানকার প্রাণীরা প্রায়শই দীর্ঘ ও কঠোর শীতের অঞ্চলে বসবাসকারী নিকটাত্মীয়দের তুলনায় কম গভীর এবং সহজে বিঘ্নিত হতে পারে এমন তন্দ্রা গ্রহণ করে।
শীতনিদ্রা আসলে একটি নিখুঁত শক্তি-সাশ্রয়ী ব্যবস্থা
লাইকার্স, বাইরে থেকে দেখলে শীতনিদ্রায় থাকা একটি প্রাণীকে মনে হতে পারে যেন সেটি কয়েক মাসের জন্য সম্পূর্ণভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর শরীর অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।
হৃদস্পন্দন কমে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়, শরীরের তাপমাত্রা নেমে আসে এবং বিপাকীয় কার্যক্রম নাটকীয়ভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে শরীর সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যক্রম যতটা সম্ভব দক্ষতার সঙ্গে বজায় রাখে।
তাই শীতনিদ্রা কোনো সাধারণ “অফ সুইচ” নয়। এটি বরং শরীরের একটি অসাধারণভাবে পরিকল্পিত শক্তি-সাশ্রয়ী ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া প্রয়োজন অনুযায়ী ধীর করা হয়। প্রকৃতি যে কতটা নিখুঁতভাবে সীমিত শক্তি ব্যবহার করে দীর্ঘ কঠিন সময় পার করার উপায় তৈরি করেছে, শীতনিদ্রা তারই অন্যতম চমকপ্রদ উদাহরণ।