প্রাণী

পরিযায়ী প্রাণীরা গন্তব্যে

হ্যালো, লাইকার্স! কোনো মানচিত্র, রাস্তার সংকেত বা পরিচিত চিহ্ন ছাড়া একটি দেশ পেরিয়ে গাড়ি চালানোকে পথ হারানোর নিশ্চিত উপায় মনে হতে পারে। অথচ প্রকৃতির কিছু অসাধারণ ভ্রমণকারী প্রতি বছর হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আশ্চর্যজনক নির্ভুলতায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
তাদের হাতে কোনো মানচিত্র নেই, কোনো জিপিএস নেই, এমনকি মানুষের মতো দৃশ্যমান রাস্তার চিহ্নও নেই। তার বদলে তারা ব্যবহার করে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, সূর্য, নক্ষত্র, গন্ধ, ভূদৃশ্য এবং নিজেদের শরীরের ভেতরে থাকা জটিল দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা।

প্রাণীরা আসলে কোন কোন দিকনির্দেশনা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে?

চৌম্বকীয় কম্পাস: অনেক পরিযায়ী প্রাণী পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে দিক নির্ণয় করতে পারে। পাখি, স্যালাম্যান্ডার, স্যামন এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এই ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ দেখা গেছে। লগারহেড কচ্ছপও পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক ও শক্তির পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে এবং সমুদ্রযাত্রার সময় তা নেভিগেশনে ব্যবহার করে।
সূর্য ও নক্ষত্র: কিছু পাখি সূর্যের অবস্থানকে একটি প্রাকৃতিক কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। তবে সূর্য আকাশে ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন করে বলে তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে এই তথ্য মিলিয়ে নিতে হয়।
রাতের পরিযানে কিছু গায়ক পাখি নক্ষত্রের বিন্যাস থেকেও দিকনির্দেশনা নিতে পারে। তারা রাতের আকাশের নির্দিষ্ট নক্ষত্র ও নক্ষত্রমণ্ডলের আপাত গতিবিধি ব্যবহার করে নিজেদের অভিমুখ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।
ভূদৃশ্যের সংকেত: সব প্রাণী আকাশ বা চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে না। কিছু প্রজাতি পর্বতমালা, উপকূলরেখা, নদী বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে। সমুদ্রের প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সমুদ্রতলের ভূ-আকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ডলফিনের মতো প্রাণীরা পানির নিচের পরিবেশের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

হাজার মাইল পাড়ি দিয়েও তারা কীভাবে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়?

পথ সমন্বয়: কিছু প্রাণী যাত্রার সময় কতটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে এবং কোন দিকে কতটা এগিয়েছে, তার একটি অভ্যন্তরীণ হিসাব রাখার মতো ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে পথ সমন্বয় বা path integration বলা হয়।
এর সাহায্যে কোনো প্রাণী আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে গেলেও নিজের অবস্থান সম্পর্কে একটি অভ্যন্তরীণ ধারণা তৈরি করতে পারে এবং পরে তুলনামূলকভাবে সরাসরি পথে ফিরে আসতে পারে।
সহজাত পরিযায়ী প্রোগ্রাম: আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছু অল্পবয়সী পরিযায়ী প্রাণী জীবনের প্রথম যাত্রাতেই এমন পথে এগিয়ে যেতে পারে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। তাদের কোনো অভিজ্ঞ বয়স্ক প্রাণী পথ দেখায় না। বরং তাদের আচরণের একটি অংশ জিনগতভাবে নির্ধারিত পরিযায়ী প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে তারা পুরো যাত্রার একটি নিখুঁত মানচিত্র জন্মের আগেই পেয়ে যায়। বরং দিক, সময় এবং দূরত্ব সম্পর্কে কিছু সহজাত নিয়ম পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের সঙ্গে মিলিয়ে তারা পথ খুঁজে নিতে পারে।
ঘরে ফেরার অসাধারণ ক্ষমতা: হোমিং পায়রার নেভিগেশন ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের আকৃষ্ট করেছে। তারা অপরিচিত স্থান থেকেও পরিচিত গন্তব্যে ফিরে আসতে পারে এবং এতে সূর্য, চৌম্বক ক্ষেত্র, গন্ধ ও ভূদৃশ্যসহ একাধিক সংকেত ভূমিকা রাখতে পারে।

গন্ধ কীভাবে প্রাণীদের পথ চিনতে সাহায্য করে?

কিছু প্রাণীর জন্য পৃথিবী শুধু দৃশ্যমান চিহ্নের সমষ্টি নয়; এটি গন্ধেরও একটি বিশাল মানচিত্র। স্যামন মাছ এর একটি চমৎকার উদাহরণ।
তরুণ স্যামন যে নদী বা জলধারায় বেড়ে ওঠে, সেই পরিবেশের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য তাদের ঘ্রাণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে। কয়েক বছর সমুদ্রে কাটানোর পর প্রজননের সময় তারা আবার সেই একই নদী ব্যবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করে।
রাসায়নিক স্মৃতি: নদীর পানিতে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেত তাদের নিজস্ব জন্মস্থানের একটি ধরনের ঘ্রাণ-পরিচয় তৈরি করতে পারে। ফলে বিশাল সমুদ্র থেকে উপকূলের কাছে পৌঁছানোর পর এই ঘ্রাণসংক্রান্ত তথ্য তাদের সঠিক নদী বা জলধারার দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
এটি দেখায় যে প্রাণীর নেভিগেশন সবসময় একটি একক ইন্দ্রিয়ের কাজ নয়। একটি দীর্ঘ যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন সংকেত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যখন প্রকৃতির এই নেভিগেশন ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে যায়

প্রাণীদের নেভিগেশন ব্যবস্থা অসাধারণ হলেও তা অপ্রতিরোধ্য নয়। আধুনিক পরিবেশে এমন কিছু পরিবর্তন তৈরি হয়েছে, যার মুখোমুখি তাদের পূর্বপুরুষদের খুব কমই হতে হয়েছে।
কৃত্রিম আলো: রাতের আকাশের সংকেত ব্যবহারকারী পরিযায়ী পাখিদের জন্য শহরের অতিরিক্ত আলো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। উজ্জ্বল ভবন বা অন্যান্য আলোকিত স্থাপনা তাদের স্বাভাবিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে এবং ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চৌম্বকীয় হস্তক্ষেপ: মানুষের তৈরি কিছু অবকাঠামো ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থানীয় চৌম্বকীয় পরিবেশে পরিবর্তন আনতে পারে। যেসব প্রাণী দিকনির্ণয়ে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য এই পরিবর্তন কখনো অতিরিক্ত বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
এমনকি ছোটখাটো পরিবর্তনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রার সময়, গতি বা পথকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রাণী হয়তো শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাবে, কিন্তু তার যাত্রা আগের তুলনায় দীর্ঘ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন কেন পরিযায়ী প্রাণীদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে?

পরিযায়ী প্রাণীরা শুধু দিকই নির্ধারণ করে না; তাদের কখন যাত্রা শুরু করতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কোথায় খাবার পাওয়া যাবে—এসবের জন্যও পরিবেশগত সংকেত ব্যবহার করে।
তাপমাত্রা, দিনের দৈর্ঘ্য, বৃষ্টিপাত এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা তাদের পরিযানের সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব সংকেতের স্বাভাবিক সময়সূচি বদলে যেতে পারে।
সময়ের অসামঞ্জস্য: কোনো পাখি যদি ঐতিহাসিক সংকেত অনুসরণ করে নির্দিষ্ট সময়ে একটি অঞ্চলে পৌঁছায়, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানে তার প্রধান খাদ্য কয়েক সপ্তাহ আগেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে পাখিটি খাবারের প্রাচুর্যের সময় মিস করতে পারে।
একইভাবে, কোনো প্রাণী যদি উষ্ণতার সংকেতের কারণে আগেভাগে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু তার গন্তব্যে তখনও পর্যাপ্ত খাদ্য বা উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হয়, তাহলেও তার বেঁচে থাকার ওপর চাপ পড়তে পারে।
এখানে সমস্যাটি শুধু পথ হারানো নয়। প্রাণী সঠিক দিকেই এগোতে পারে, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে পুরো পরিযায়ী যাত্রা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির জিপিএস আসলে কতটা অসাধারণ?

পরিযায়ী প্রাণীদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের নেভিগেশন কোনো একক “প্রাকৃতিক জিপিএস” নয়। বরং এটি বিভিন্ন ইন্দ্রিয়, স্মৃতি, সহজাত আচরণ এবং পরিবেশগত সংকেতের সমন্বয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা।
একটি পাখি হয়তো দিনের বেলায় সূর্যের অবস্থান ব্যবহার করছে, রাতে নক্ষত্রের বিন্যাস থেকে দিক বুঝছে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে নিজের অভিমুখ ঠিক করছে এবং পরিচিত ভূদৃশ্য দেখে যাত্রাপথের শেষ অংশটি সম্পন্ন করছে। অন্যদিকে কোনো সামুদ্রিক প্রাণী রাসায়নিক সংকেত, সমুদ্রের স্রোত বা সমুদ্রতলের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করতে পারে।
সুতরাং, শীতের জন্য দক্ষিণে উড়ে যাওয়া পরবর্তী পাখির ঝাঁক শুধু কোনো অস্পষ্ট সহজাত প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করছে না। তারা এমন এক বহুমাত্রিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যার প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে বিস্ময়কর এবং একসঙ্গে কাজ করলে তা আরও অসাধারণ হয়ে ওঠে।
প্রকৃতি তাদের হাতে কোনো মানচিত্র দেয়নি, কিন্তু দিয়েছে পৃথিবীকে পড়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আর সেই অদৃশ্য কম্পাস, আকাশের সংকেত, গন্ধের স্মৃতি এবং ভূদৃশ্যের পরিচয় মিলিয়েই তারা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বারবার নিজেদের গন্তব্য খুঁজে নেয়।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন