প্রাণী

প্রাণীদের শরীরের ঝলমলে রং

প্রিয় পাঠকগণ! কিছু প্রাণীকে দেখলে মনে হয় যেন তারা প্রকৃতির বিশাল এক রঙের বাক্স থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল রংগুলো বেছে নিয়ে শরীরে মেখে নিয়েছে।
ছোট্ট ট্র্যাফিক লাইটের মতো জ্বলজ্বলে একটি ব্যাঙ, উড়ন্ত রামধনুর মতো রঙিন একটি পাখি কিংবা জীবন্ত আতশবাজির মতো ঝলমলে একটি মাছ সহজেই আমাদের বিস্মিত করে। কিন্তু এই উজ্জ্বল রংগুলো নিছক সৌন্দর্যের জন্য নয়।
প্রাণীজগতে রং অনেকটা একটি বহুমুখী সরঞ্জামের মতো, যা কখনও শিকারিকে সতর্ক করে, কখনও সঙ্গী আকর্ষণ করে, আবার কখনও প্রাণীকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে বা অন্য প্রাণীর ছদ্মবেশ ধারণ করতে সাহায্য করে।

উজ্জ্বল রং হতে পারে বিপদের সতর্কবার্তা

কিছু প্রাণী উজ্জ্বল রং ব্যবহার করে স্পষ্ট একটি বার্তা দেয়—“আমার কাছ থেকে দূরে থাকো।” এই ধরনের রংকে বলা হয় সতর্কতামূলক রং। যেসব প্রাণী বিষাক্ত, বিষধর, তিক্ত স্বাদের বা শিকারির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তারা প্রায়ই হলুদ, কমলা, লাল, নীল কিংবা কালোর মতো তীব্র রং ব্যবহার করে নিজেদের আলাদা করে চেনায়।
এটি অনেকটা আপনার বাড়ির সামনে একটি বড় সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো। শিকারিরা অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত শিখতে পারে যে নির্দিষ্ট ধরনের উজ্জ্বল রঙের প্রাণীকে আক্রমণ করা ভালো সিদ্ধান্ত নয়। বিষাক্ত ডার্ট ব্যাঙ এর পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। তাদের উজ্জ্বল দেহের রং সম্ভাব্য শিকারিকে দূরে থাকার সংকেত দিতে সাহায্য করে।

রং কখনও প্রাণীকে লুকিয়েও রাখতে পারে

শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও, উজ্জ্বল রং ছদ্মবেশ হিসেবেও কাজ করতে পারে। কোনো প্রাণী যদি এমন পরিবেশে বাস করে যেখানে চারপাশে রঙিন ফুল, প্রবাল, শৈবাল বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ রয়েছে, তাহলে সেই পরিবেশের সঙ্গে মিলতে উজ্জ্বল রংই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
প্রবাল প্রাচীরের মাছ এর ভালো উদাহরণ। তাদের চারপাশের পরিবেশ এত বৈচিত্র্যময় ও রঙিন যে শরীরের উজ্জ্বল নকশা তাদের দৃশ্যমান হওয়ার পরিবর্তে বরং পরিবেশের মধ্যে হারিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
কিছু প্রাণী শরীরের আকৃতি ভেঙে দেওয়ার জন্য ডোরা, ছোপ বা জটিল নকশাও ব্যবহার করে। এতে শিকারির পক্ষে প্রাণীটির সঠিক আকৃতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। অনেকটা কনফেটিতে ভরা একটি ঘরের মধ্যে একই রঙের একটি ছোট টুকরো খুঁজে বের করার মতো।

ঝলমলে রং সঙ্গী আকর্ষণের গোপন অস্ত্র

অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে উজ্জ্বল রং মূলত সঙ্গী আকর্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। একটি প্রাণীর উজ্জ্বল ও সুগঠিত রং তার স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শারীরিক সক্ষমতা কিংবা প্রজনন-সামর্থ্যের সংকেত দিতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতির ভাষায় এটি অনেকটা নিজের ভালো অবস্থার বিজ্ঞাপন দেওয়ার মতো।
ময়ূর এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। পুরুষ ময়ূরের বিশাল, চোখের মতো নকশাযুক্ত রঙিন লেজ সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক প্রজাতিতেই এমন শারীরিক প্রদর্শন সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বেশি রঙিন হওয়ারও মূল্য আছে—উজ্জ্বল দেহ শিকারির চোখে সহজে পড়তে পারে এবং অতিরিক্ত অলংকার বহন করতেও শক্তি লাগে।

কিছু প্রাণী বিপজ্জনক প্রাণীর ছদ্মবেশ ধারণ করে

সব উজ্জ্বল রঙের প্রাণী কিন্তু সত্যিই বিপজ্জনক নয়। কিছু নিরীহ প্রজাতি এমন প্রাণীর রং ও নকশা অনুকরণ করে, যাদের শিকারিরা এড়িয়ে চলে। এই কৌশলকে বলা হয় অনুকরণ বা মিমিক্রি।
যদি কোনো শিকারি একটি নিরীহ প্রাণীকে বিষাক্ত বা অখাদ্য প্রাণী বলে ভুল করে, তাহলে সেই ভুল ধারণাই অনুকরণকারী প্রাণীটির জীবন বাঁচাতে পারে। এটি অনেকটা এমন পোশাক পরার মতো, যা দূর থেকেই বলে দেয়—“আমাকে আক্রমণ করা ভালো ধারণা নয়।”
সময়ের সঙ্গে এই ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে আরও নিখুঁত হতে পারে। ফলে কোনো প্রাণী নিজের প্রকৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব শক্তিশালী না হয়েও অন্যের বিপজ্জনক পরিচয়ের সুবিধা নিতে পারে।

পরিস্থিতি বদলালে রংও বদলে যেতে পারে

কিছু প্রাণীর রং স্থায়ী নয়। মেজাজ, তাপমাত্রা, আলো, ঋতু, সামাজিক পরিস্থিতি কিংবা প্রজননকাল অনুযায়ী তাদের শরীরের রং পরিবর্তিত হতে পারে।
গিরগিটি রং পরিবর্তনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তবে তারা সবসময় শুধু পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য রং পরিবর্তন করে না। সামাজিক যোগাযোগ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং অন্য গিরগিটির প্রতি নিজের অবস্থা জানানোর ক্ষেত্রেও রঙের পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও প্রজনন ঋতুতে দেহের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, যাতে সম্ভাব্য সঙ্গীর কাছে তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়। আবার বছরের অন্য সময়ে সেই রং তুলনামূলকভাবে ম্লান হতে পারে। তাই প্রাণীর রংকে সবসময় স্থির পোশাক হিসেবে দেখা ঠিক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি সক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা।
প্রাণীদের উজ্জ্বল রং প্রথম দেখায় নিছক সৌন্দর্য বা প্রকৃতির খেয়াল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এর পেছনে রয়েছে বেঁচে থাকার অসাধারণ কৌশল। কোনো রং শিকারিকে সতর্ক করে, কোনোটি পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করে, কোনোটি সঙ্গী আকর্ষণ করে, আবার কোনোটি অন্য প্রাণীর পরিচয় নকল করে জীবন রক্ষা করে।
প্রকৃতি সাধারণত কোনো বৈশিষ্ট্য শুধু দেখানোর জন্য তৈরি করে না। তাই পরের বার যখন কোনো উজ্জ্বল রঙের প্রাণী চোখে পড়বে, শুধু তার সৌন্দর্য দেখে থেমে যাবেন না। সেই রঙের আড়ালে হয়তো লুকিয়ে আছে সতর্কবার্তা, প্রেমের আহ্বান, ছদ্মবেশ কিংবা বেঁচে থাকার এক অসাধারণ কৌশল।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন