উদ্ভিদ

ফুল সাজালে পেশাদারদের মতো

লাইকার্স, আপনারা কি কখনো বাড়িতে তাজা ফুল এনে ভেবেছেন, ছবিতে দেখা সুন্দর তোড়াগুলোর মতো আপনাদের সাজানো ফুলগুলো কেন ঠিক তেমন আকর্ষণীয় দেখায় না?
আমরা হয়তো মনে করি ফুল সাজানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু বাস্তবে অনেক সুন্দর ফুলের সজ্জাই কয়েকটি সহজ নীতির ওপর তৈরি হয়।
উচ্চতা, ব্যবধান, আকৃতি, রঙ এবং ফুলের দিকের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই অল্প কয়েকটি ফুল দিয়েও একটি গোছানো, ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বাভাবিক দেখতে তোড়া তৈরি করা সম্ভব। চলুন, এমন ছয়টি সহজ কৌশল জেনে নিই, যেগুলো আমরা বাড়িতেই অনুশীলন করতে পারি।

১. উপরের অংশ হালকা রাখুন

একটি সুন্দর ফুলের সজ্জার জন্য প্রথমেই দৃশ্যগত ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। আমরা ছোট কুঁড়ি এবং হালকা রঙের ফুলগুলো তুলনামূলকভাবে উপরের দিকে রাখতে পারি। অন্যদিকে, বড় ফুল ও গাঢ় রঙের ফুলগুলো নিচের অংশ বা কেন্দ্রের কাছাকাছি রাখলে সজ্জাটি আরও স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ দেখাতে পারে।
আকার ও রঙের ভারসাম্য: একটি বড় ফুল স্বাভাবিকভাবেই ছোট একটি কুঁড়ির তুলনায় বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাই বড় ফুলগুলোকে কেন্দ্রের কাছাকাছি রাখলে পুরো নকশায় একটি দৃশ্যগত ভিত্তি তৈরি হয়। একই ধরনের আকৃতি বা গঠনের ফুলগুলোকে কাছাকাছি রেখে পরে ভিন্ন রঙ বা আকৃতির ফুল যোগ করলে তোড়াটি একদিকে সংযুক্ত, অন্যদিকে বৈচিত্র্যময় দেখায়।

২. বিভিন্ন উচ্চতা তৈরি করুন

সব ফুলকে একই উচ্চতায় রাখলে তোড়াটি সমতল এবং কিছুটা অনমনীয় দেখাতে পারে। এর পরিবর্তে, আমরা ফুলগুলোকে বিভিন্ন স্তরে সাজাতে পারি। কয়েকটি ডাঁটা মূল গুচ্ছের ওপরে থাকবে, কিছু ফুল মাঝামাঝি অংশ পূরণ করবে এবং ছোট ফুলগুলো পাত্রের কাছাকাছি রাখা যেতে পারে।
সব প্রধান ফুলকে একটি সরলরেখায় না রেখে কিছু ডাঁটা সামান্য সামনে, কিছু পেছনে এবং অন্যগুলো ডানে বা বামে সরিয়ে দিলে সজ্জায় গভীরতা তৈরি হয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি লম্বা ডাল তোড়ায় উচ্চতা যোগ করতে পারে, মাঝারি আকারের ফুলগুলো কেন্দ্র পূরণ করতে পারে এবং ছোট ফুলগুলো নিচের অংশকে সম্পূর্ণ করতে পারে। এই স্তরভিত্তিক বিন্যাস পুরো সজ্জায় একটি স্বাভাবিক গতি এনে দেয়।

৩. গোড়ার অংশ একত্রিত করুন, উপরের অংশ খুলে দিন

আমরা একটি ফুলের তোড়াকে ছোট একটি গাছের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। গাছের মতোই ডাঁটাগুলো গোড়ার দিকে কাছাকাছি থাকবে, কিন্তু ফুল ও ডালপালাগুলো উপরের দিকে স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে নিচের অংশে দৃঢ়তা এবং উপরের অংশে হালকাভাব তৈরি হয়।
সাজানো শুরু করার সময় কয়েকটি ডাঁটা গোড়ার কাছে একসঙ্গে ধরে তাদের অবস্থান পরীক্ষা করে নিতে পারি। এরপর ফুলগুলোকে ধীরে ধীরে বাইরের দিকে খুলে দিতে পারি।
গোছানো, কিন্তু অনমনীয় নয়: প্রতিটি ফুলকে নিজের আকৃতি প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা দিন। গোড়ার অংশ একত্রিত থাকলেও উপরের ফুলগুলোকে একটু স্বাধীনভাবে ছড়িয়ে দিলে তোড়াটি অনেক বেশি স্বাভাবিক দেখায়।

৪. ভরাট ও ফাঁকা জায়গার মিশ্রণ রাখুন

ফুল সাজানোর সময় ফাঁকা জায়গাকে অনেকেই উপেক্ষা করেন। কিন্তু একটি সুন্দর তোড়ায় খালি জায়গারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি অংশ যদি ফুল দিয়ে পূর্ণ থাকে, তাহলে আলাদা আলাদা ফুলের সৌন্দর্য বোঝা কঠিন হয়ে যায়। আবার অতিরিক্ত ফাঁকা জায়গা থাকলে সজ্জাটি অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে।
আমরা তাই ভরাট অংশের সঙ্গে ফাঁকা জায়গার ভারসাম্য তৈরি করতে পারি। মাঝের অংশে তুলনামূলক বেশি ফুল রাখা যেতে পারে, আর বাইরের দিকে কয়েকটি ডাল ও পাতা ছড়িয়ে দিয়ে মাঝখানে কিছুটা খালি জায়গা রাখা যায়।
কিছু সরু ডাল বা পাতা এই ফাঁকা অংশের দিকে স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে পারে। এতে তোড়ার মধ্যে একটি মৃদু ছন্দ তৈরি হয় এবং দর্শকের চোখও সজ্জার এক অংশ থেকে অন্য অংশে সহজে চলে যায়।

৫. ফুল ও পাতার মধ্যে ভারসাম্য রাখুন

ফুল সাধারণত সজ্জার প্রধান আকর্ষণ তৈরি করে, আর পাতা ও ডালপালা পুরো নকশার আকৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোপুরি ফোটা বড় ফুলগুলোকে মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা যেতে পারে। ছোট কুঁড়ি সেখানে কোমলতা ও বৈচিত্র্য যোগ করবে। অন্যদিকে, পাতাগুলো ফুলের মধ্যকার অতিরিক্ত ফাঁকা জায়গা পূরণ করার পাশাপাশি সজ্জার বিভিন্ন অংশকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
কম বা বেশি—দুটিই সমস্যা হতে পারে: অতিরিক্ত ফুল ব্যবহার করলে তোড়াটি ভিড়াক্রান্ত দেখাতে পারে। আবার খুব বেশি পাতা ব্যবহার করলে ফুলের ওপর থেকে মনোযোগ সরে যেতে পারে। তাই ফুল ও পাতার সুচিন্তিত মিশ্রণই একটি পরিপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক চেহারা তৈরি করে।

৬. ফুলগুলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিন

ফুলের দিক পুরো সজ্জার চেহারা বদলে দিতে পারে। সব ফুলকে একই দিকে মুখ করে রাখলে তোড়াটি কিছুটা স্থির ও একঘেয়ে মনে হতে পারে। এর পরিবর্তে, কয়েকটি ফুলকে উপরের দিকে, কিছু ফুলকে বাইরের দিকে এবং অন্য কয়েকটিকে কেন্দ্রের দিকে হালকা কোণে রাখা যায়।
এভাবে বিভিন্ন ডালের মধ্যে একটি পারস্পরিক সংযোগের অনুভূতি তৈরি হয়। মনে হয় যেন ফুলগুলো আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে নেই, বরং একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে।
যদি তোড়ার কোনো একটি দিক বেশি ভারী মনে হয়, তাহলে বিপরীত দিকে একটি ডাল বা ফুল যোগ করা যেতে পারে। এতে পুরো সজ্জায় আরও ভালো দৃশ্যগত ভারসাম্য তৈরি হয়।

সাধারণ ফুল দিয়েই অনুশীলন করুন

লাইকার্স, এই কৌশলগুলো অনুশীলন করার জন্য আমাদের অনেক ফুলের প্রয়োজন নেই। একগুচ্ছ তাজা ফুল বা কয়েকটি ডাল দিয়েই শুরু করা যায়। প্রথমে উচ্চতা ঠিক করুন, তারপর ফুলের মধ্যকার ব্যবধান, দিক এবং অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তন করুন।
একবারে একটি ডাল সরানো বেশ কার্যকর হতে পারে। কখনও কখনও একটি ফুলকে সামান্য ওপরে তোলা, একটু সামনে আনা কিংবা কয়েক ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেওয়াই পুরো সজ্জার চেহারা বদলে দিতে পারে।
নিয়মিত অনুশীলন করলে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন ফুল সাজানোর সময় প্রতিটি পরিবর্তন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করেও আমরা বুঝতে পারব কোন ডাল কোথায় ভালো মানাবে।

নিজের ফুল সাজানোর শৈলী খুঁজে নিন

এই ছয়টি কৌশল আমাদের ফুল সাজানোর একটি সহজ ভিত্তি দেয়—দৃশ্যগত ভারসাম্য রাখা, বিভিন্ন উচ্চতা তৈরি করা, গোড়ার অংশ একত্রিত করা, ফাঁকা ও ভরাট জায়গার বৈচিত্র্য আনা, ফুল ও পাতার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা এবং বিভিন্ন দিকে ফুল ছড়িয়ে দেওয়া।
তবে এগুলো কোনো কঠোর নিয়ম নয়। ফুলের ধরন, পাত্রের আকার, ঘরের পরিবেশ এবং আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এগুলো পরিবর্তন করা যায়। কখনও একটু অসম বিন্যাসই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় ফল দিতে পারে।
লাইকার্স, পরের বার যখন তাজা ফুল সাজাবেন, তখন একসঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন করার দরকার নেই। শুধু একটি বা দুটি কৌশল বেছে নিয়ে পরীক্ষা করুন এবং দেখুন ফলাফলে কতটা পার্থক্য আসে। হয়তো আপনার পরবর্তী তোড়াটিই এমন একটি নিজস্ব শৈলী তৈরি করবে, যা দেখলেই সবাই বুঝবে—এটি আপনার হাতে সাজানো।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন