উদ্ভিদ
সূর্যমুখী সূর্যকে অনুসরণ
প্রিয় পাঠকগণ, আপনারা কি কখনো সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ভেবে দেখেছেন, কেন এতগুলো কচি ফুল একই দিকে মুখ করে থাকে?
তাদের উজ্জ্বল মুখগুলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনের আলোর সঙ্গে অবস্থান বদলায় বলে মনে হয়, যেন তারা নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা প্রায়শই এই ঘটনাকে ফুলের “সূর্যকে অনুসরণ করা” বলে বর্ণনা করি।
তবে এর পেছনে রয়েছে এক চমৎকার জৈবিক প্রক্রিয়া। আজ আমরা জানব এই নড়াচড়া কীভাবে ঘটে এবং সূর্যমুখী পরিপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন এই আচরণ বদলে যায়।
সব সূর্যমুখী সারাদিন ঘোরে না
আমরা হয়তো ভাবতে পারি যে প্রতিটি সূর্যমুখী ফুল সারাদিন পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঘুরে সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। এই নড়াচড়া মূলত কচি ও বিকাশমান সূর্যমুখীতে বেশি দেখা যায়। ফুলের মাথা পুরোপুরি পরিপক্ক হওয়ার আগে কাণ্ডের উপরের অংশ সক্রিয়ভাবে বাড়তে থাকে এবং আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলাতে পারে।
গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাণ্ড শক্ত হয়ে ওঠে এবং ফুলের মাথাও ভারী হয়। ফুলটি পরিপক্ক হলে এর দৈনন্দিন নড়াচড়া অনেকটাই কমে যায় এবং এটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দিকে স্থির হয়ে থাকে। অনেক পরিণত সূর্যমুখীর ফুলের মাথা পূর্বমুখী দেখা যায়, যা সকালের আলো গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
আলোর ভূমিকা
তাহলে পেশী বা সচল অস্থিসন্ধি ছাড়াই একটি কচি সূর্যমুখী কীভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আলো এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির হরমোন, বিশেষ করে অক্সিনের মধ্যে। অক্সিন উদ্ভিদের কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং কাণ্ডের বাঁকানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
যখন আলো প্রধানত একদিক থেকে আসে, তখন কাণ্ডের বর্ধনশীল অংশে অক্সিনের বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে। কম আলোকিত দিকের কোষগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি লম্বা হলে কাণ্ডে অসম বৃদ্ধি তৈরি হয়। এই অসম বৃদ্ধির ফলেই কাণ্ড ধীরে ধীরে বাঁকে এবং ফুলের মাথা আলোর দিকে অবস্থান পরিবর্তন করে।

কাণ্ড কেন বাঁকে?
অসম বৃদ্ধি কীভাবে কাজ করে?
একটি কচি সূর্যমুখীর কাণ্ডকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কল্পনা করুন। আলো যদি একদিকে বেশি তীব্রভাবে পৌঁছায়, তাহলে কাণ্ডের দুই পাশের কোষ একই হারে বৃদ্ধি নাও পেতে পারে। ছায়াযুক্ত পাশে কোষের প্রসারণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলে সেই পাশটি দ্রুত লম্বা হয়।
একদিকে বৃদ্ধি কিছুটা দ্রুত হওয়ার কারণে কাণ্ড ধীরে ধীরে আলোর দিকে বাঁকতে থাকে। এই নড়াচড়া হঠাৎ ঘটে না। বরং কয়েক ঘণ্টা ধরে কোষের বৃদ্ধির ক্ষুদ্র পরিবর্তন জমা হতে থাকে এবং এর ফলে ফুলের মাথার অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়।
রাতে কী ঘটে?
দিনের আলো কমে যাওয়ার পর সূর্যমুখী শেষ যে অবস্থানে ছিল, সেখানেই পুরোপুরি স্থির হয়ে থাকে না। কচি গাছের অভ্যন্তরীণ বৃদ্ধির ছন্দ চলতে থাকে এবং রাতের সময় কাণ্ড ধীরে ধীরে এমন অবস্থানে ফিরে আসতে পারে, যা পরের সকালের আলোর জন্য উপযোগী।
তাই এই ঘটনাকে দ্রুত ঘূর্ণনের মতো কল্পনা করা ঠিক নয়। আমরা কোনো সূর্যমুখীকে যন্ত্রের মতো চোখের সামনে ঘুরতে দেখতে পাব না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাণ্ডের বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র পরিবর্তন জমা হয়ে সকাল ও সন্ধ্যার মধ্যে একটি লক্ষণীয় অবস্থানগত পার্থক্য তৈরি করে।
নড়াচড়া কেন থেমে যায়?
সূর্যমুখী পরিপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাণ্ডের বর্ধনশীল অংশ আগের তুলনায় কম নমনীয় হয়ে পড়ে। একই সময়ে ফুলের মাথা বড় ও ভারী হয় এবং গাছের বৃদ্ধির ধরনও পরিবর্তিত হয়। ফলে পরিবর্তনশীল আলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়।
এটি বিষয়টি বোঝার একটি সহজ উপায় দেয়। একটি কচি সূর্যমুখী তখনও সক্রিয়ভাবে বেড়ে উঠছে, আর একটি পরিণত সূর্যমুখী তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাই কচি গাছের অবস্থানগত পরিবর্তন বেশি চোখে পড়লেও পরিণত ফুলের ক্ষেত্রে তা অনেক কম দৃশ্যমান।

প্রকৃতির একটি অসাধারণ পাঠ
আমরা সাধারণত নড়াচড়াকে পেশী বা কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু উদ্ভিদ আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদাহরণ দেখায়। একটি সূর্যমুখী আলো-সংবেদনশীল বৃদ্ধি, কোষের অসম প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ জৈবিক সংকেতের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।
এর জন্য কোনো দ্রুত যান্ত্রিক ঘূর্ণনের প্রয়োজন হয় না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈবিক পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে জমা হয়ে এমন একটি দৃশ্যমান ফল তৈরি করতে পারে, যা দূর থেকে বেশ জাদুকরী মনে হয়। সূর্যমুখীর এই আচরণ তাই শুধু একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়; এটি উদ্ভিদ কীভাবে তার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বৃদ্ধি পায়, তারও একটি চমৎকার উদাহরণ।
পরের বার সূর্যমুখী দেখলে পরীক্ষা করে দেখুন
সুতরাং, লাইকার্স, পরের বার যখন দিনের আলোর দিকে মুখ করে থাকা কোনো কচি সূর্যমুখী দেখবেন, তখন সেটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখুন। এটি শুধু সূর্যকে “ধাওয়া” করছে না। এর অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কাণ্ডের ভেতরের বৃদ্ধির সূক্ষ্ম পরিবর্তন, যেখানে আলো এবং অক্সিন একসঙ্গে উদ্ভিদের বিকাশকে প্রভাবিত করে।
প্রকৃতি প্রায়ই তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্যগুলো এমন সাধারণ দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখে, যেগুলো আমরা প্রতিদিন দেখেও গভীরভাবে লক্ষ্য করি না। আশেপাশে যদি সূর্যমুখী গাছ থাকে, তাহলে সকালে এবং দিনের পরের দিকে আবার সেগুলোর দিক লক্ষ্য করে দেখুন। হয়তো এমন কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়বে, যা আগে কখনো খেয়াল করেননি।