প্রাণী

বিড়াল ছুটে আসে কেন?

শুভেচ্ছা, পাঠকগণ! আপনারা কি কখনো খেয়াল করেছেন যে, যখনই আপনি কোনো মচমচে খাবারের প্যাকেট খোলেন, আপনার বিড়ালটি যেন মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে আসে?
বাইরে থেকে এটিকে নিছক মজার অভ্যাস মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিড়ালের অসাধারণ শ্রবণশক্তি, শিকারের প্রবৃত্তি, কৌতূহল এবং শেখা আচরণের চমৎকার সমন্বয়।
একটি সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যাগ বা খাবারের মোড়কের খসখসে শব্দও তাদের কাছে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য বহন করতে পারে। তাই মচমচে শব্দ শুনে বিড়ালের কান খাড়া হয়ে যাওয়া বা দ্রুত কাছে চলে আসা আসলে তাদের স্বাভাবিক আচরণেরই একটি আকর্ষণীয় প্রকাশ।

মচমচে শব্দে এমন কিছু কম্পাঙ্ক থাকে যা মানুষ শুনতে পায় না

গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে বিড়ালের শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। মানুষ সাধারণত প্রায় ২০,০০০ হার্টজ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পারে, যেখানে বিড়াল প্রায় ৬৪,০০০ হার্টজ পর্যন্ত উচ্চ-কম্পাঙ্কের শব্দ শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে এমন কিছু সূক্ষ্ম কিচিরমিচির, খসখসে শব্দ এবং কম্পনও তারা ধরতে পারে, যা মানুষের কানে খুবই দুর্বল বা একেবারেই শোনা যায় না।
যখন একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ, কাগজ বা খাবারের মোড়ক মচমচ করে, তখন সেটি একাধিক ধরনের শব্দ ও কম্পাঙ্ক তৈরি করে। মানুষ সাধারণত শুধু প্রধান খসখসে শব্দটিই শুনতে পায়, কিন্তু বিড়াল একই শব্দের মধ্যে থাকা আরও সূক্ষ্ম উচ্চ-কম্পাঙ্কের সংকেত শনাক্ত করতে পারে। তাদের কাছে তাই একটি সাধারণ মোড়কের শব্দ আমাদের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং বিস্তারিত মনে হতে পারে।
এই অসাধারণ শ্রবণক্ষমতাই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন একটি বিড়াল অন্য ঘর থেকে আসা খাবারের প্যাকেটের হালকা শব্দেও হঠাৎ সাড়া দিতে পারে, এমনকি মানুষ সেটি প্রায় খেয়াল না করলেও।

মচমচে শব্দ তাদের কাছে শিকারের সংকেতের মতো মনে হতে পারে

গৃহপালিত বিড়াল হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বসবাস করলেও তাদের মধ্যে বন্য পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া অনেক স্বাভাবিক আচরণ এখনো রয়ে গেছে। শিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দের প্রতি তাদের মস্তিষ্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
শুকনো পাতা, ঘাস বা ঝোপের মধ্যে ছোট কোনো প্রাণী চলাচল করলে প্রায়ই মৃদু খসখসে শব্দ তৈরি হয়। হালকা প্লাস্টিক বা কাগজের মচমচে শব্দের সঙ্গে এই প্রাকৃতিক শব্দের কিছুটা মিল রয়েছে। একটি বিড়ালের কাছে তাই এমন শব্দ ঘাস বা পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা কোনো ছোট প্রাণীর নড়াচড়ার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
এই সংযোগ সম্পূর্ণ সচেতনভাবে তৈরি হতে হয় না। এমনকি যে বিড়াল কখনো বাইরে গিয়ে শিকার করেনি, তার মধ্যেও এই সহজাত প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। ফলে একটি অচেনা খসখসে শব্দ শুনলেই সে কাছে গিয়ে উৎসটি পরীক্ষা করতে চায়।

মচমচে শব্দ খাবার বা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে

অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিড়াল বিভিন্ন শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট ঘটনার সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। যদি খাবার প্রায়ই কোনো শব্দযুক্ত প্যাকেট বা থলি থেকে বের করা হয়, তাহলে বিড়াল ধীরে ধীরে সেই শব্দটিকে খাবারের সঙ্গে যুক্ত করতে শিখতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের মচমচে শব্দ শুনলেই সে খাবার, উত্তেজনা বা মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার প্রত্যাশা করতে পারে। অর্থাৎ শব্দটি নিজেই হয়তো তার কাছে পুরস্কারের সংকেত হয়ে ওঠে।
খেলনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের শেখা আচরণ দেখা যেতে পারে। অনেক বিড়ালের খেলনার ভেতরে মচমচে উপাদান রাখা হয়, কারণ এই শব্দ তাদের স্বাভাবিক কৌতূহল ও খেলার প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে একটি সাধারণ কাগজের টুকরো বা হালকা শব্দ করা বস্তু অনেক সময় বিড়ালের কাছে দামি খেলনার মতোই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
এই শেখা আচরণটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন অনেক বিড়াল খাবারের প্যাকেট খোলার শব্দ শুনেই রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে যায়।

মচমচে বস্তু কৌতূহল, খেলা এবং অন্বেষণ বাড়িয়ে দেয়

বিড়াল স্বভাবতই কৌতূহলী প্রাণী। তারা আশেপাশের পরিবেশে নতুন কিছু ঘটলেই তা পরীক্ষা করতে চায়, বিশেষ করে এমন বস্তু যা স্পর্শ করলে সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
মচমচে বস্তু এই ক্ষেত্রে বিশেষ আকর্ষণীয়। বিড়াল থাবা দিয়ে স্পর্শ করলেই যদি বস্তুটি শব্দ করে, তাহলে সেই প্রতিক্রিয়া তাকে আবার সেটি স্পর্শ করতে উৎসাহিত করে। এরপর সে বস্তুটিকে ঠেলে দিতে, তাড়া করতে, কামড়াতে বা থাবা দিয়ে আঘাত করতে পারে।
এই আচরণ অনেকটা শিকারের অনুকরণের মতো। একটি হালকা বস্তু মেঝেতে নড়াচড়া করা, হঠাৎ শব্দ করা এবং আবার থেমে যাওয়া বিড়ালের স্বাভাবিক শিকারি প্রবৃত্তিকে সক্রিয় করতে পারে। এর ফলে একই সঙ্গে শারীরিক নড়াচড়া এবং মানসিক উদ্দীপনা তৈরি হয়।
তবে প্লাস্টিকের ব্যাগ বা খাবারের মোড়ক দিয়ে বিড়ালকে খেলতে দিলে অবশ্যই তত্ত্বাবধান করা উচিত। পাতলা প্লাস্টিক ছিঁড়ে গেলে তা গিলে ফেলা বা শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিশেষভাবে বিড়ালের জন্য তৈরি মচমচে খেলনা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।

সব মচমচে শব্দ কিন্তু বিড়ালের কাছে আনন্দদায়ক নয়

মজার বিষয় হলো, সব ধরনের মচমচে শব্দ বিড়ালকে একইভাবে আকর্ষণ করে না। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এর একটি ভালো উদাহরণ। অনেক বিড়াল ফয়েলের ওপর হাঁটতে বা সেটির কাছে যেতে দ্বিধা করে, আবার কেউ কেউ এটিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে।
নরম প্লাস্টিক বা কাগজের তুলনায় ফয়েল প্রায়ই তীক্ষ্ণ ও হঠাৎ পরিবর্তনশীল শব্দ তৈরি করে। এই শব্দ কিছু বিড়ালের সংবেদনশীল কানের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। পাশাপাশি ফয়েলের চকচকে পৃষ্ঠে আলো প্রতিফলিত হওয়ায় একটি অপরিচিত দৃশ্যমান প্রভাবও তৈরি হয়।
এই কারণেই কিছু পোষ্য মালিক অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কাউন্টারটপ বা আসবাবপত্রে ওঠার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করতে সাময়িকভাবে ফয়েল ব্যবহার করেন। তবে প্রতিটি বিড়ালের প্রতিক্রিয়া এক নয়। কেউ ফয়েলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারে, আবার কেউ এটি দেখলেই দূরে সরে যেতে পারে।

বিড়ালের মচমচে শব্দের প্রতি আকর্ষণের পেছনে আসলে কী?

কুঁচকানো বা মচমচে বস্তুর প্রতি বিড়ালের আকর্ষণ জীববিজ্ঞান, সহজাত প্রবৃত্তি এবং শেখা আচরণের একটি চমৎকার সংমিশ্রণ। তাদের অসাধারণ শ্রবণশক্তি এমন অনেক শব্দের সূক্ষ্মতা শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের কানে ধরা পড়ে না। একই সঙ্গে তাদের প্রাচীন শিকারি প্রবৃত্তি খসখসে শব্দকে সম্ভাব্য শিকারের নড়াচড়ার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
এর সঙ্গে যখন খাবার, খেলনা বা মানুষের মনোযোগের মতো ইতিবাচক অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়, তখন একটি সাধারণ মচমচে শব্দ আরও শক্তিশালী আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। তাই পরের বার খাবারের প্যাকেট খুলতেই আপনার বিড়ালটি দৌড়ে এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
লাইকার্স, আপনার বিড়ালও কি মচমচে প্যাকেটের শব্দ শুনলেই ছুটে আসে? হয়তো তার কাছে সেটি শুধু একটি শব্দ নয়—বরং খাবার, খেলা, কৌতূহল এবং হাজার বছরের শিকারি প্রবৃত্তির এক ছোট্ট সংকেত!

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন