প্রাণী

বিড়াল কেন লোম চাটে?

প্রিয় পাঠকগণ! বাড়িতে একটি শান্ত মুহূর্ত আমাদের বিড়ালদের সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে।
এক মুহূর্তে তারা হয়তো ঘর ঘুরে দেখছে বা কোনো রোদ ঝলমলে কোণে বিশ্রাম নিচ্ছে, আর পরের মুহূর্তেই যত্নসহকারে নিজেদের লোম পরিষ্কার করতে শুরু করছে।
পরিচিত এই অভ্যাসটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। লোম পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে স্বস্তি পাওয়া, ত্বকের অস্বস্তি সামলানো কিংবা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সঙ্গেই বিড়ালের এই পরিচর্যার অভ্যাস জড়িত। চলুন জেনে নেওয়া যাক, বিড়াল কেন এত যত্ন নিয়ে নিজেদের লোম চাটে এবং কোন পরিবর্তনগুলো আমাদের গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করা উচিত।

লোম পরিষ্কার রাখা

সবচেয়ে সাধারণ কারণটি সহজ: বিড়াল নিজেদের পরিষ্কার করে। বিড়ালের জিহ্বার খসখসে পৃষ্ঠ লোমে জমে থাকা আলগা লোম, ধুলো এবং ছোট ছোট ময়লার কণা সরাতে সাহায্য করে। শরীর পরিষ্কার করার সময় তারা জট পাকানো লোমও কিছুটা মসৃণ করে এবং নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখে।
ঘুম থেকে ওঠার পর, খাওয়া শেষ করার পরে কিংবা ঘর ঘুরে ফিরে আসার পর আমরা প্রায়ই এই আচরণ দেখতে পাই। একটি বিড়াল সাধারণত থাবা বা বুক থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে শরীরের পাশ, পিঠ এবং লেজের দিকে এগিয়ে যায়। নিয়মিত এই পরিচর্যা ত্বক ও লোমকে ভালো অবস্থায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে শান্ত থাকা

নিজেকে পরিষ্কার করা শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়, বিড়ালের স্বস্তি পাওয়ার একটি উপায়ও হতে পারে। বাড়ির আসবাবপত্র সরানো, নতুন অতিথি আসা, নতুন পোষা প্রাণী যুক্ত হওয়া কিংবা অপরিচিত পরিবেশে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের পর কোনো কোনো বিড়াল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শরীর পরিষ্কার করতে পারে।
বারবার চাটা একটি বিড়ালের জন্য নিজেকে শান্ত করার পরিচিত আচরণ হতে পারে। চারপাশের পরিবেশ যখন অস্বাভাবিক মনে হয়, তখন এই পরিচিত কাজটি তাকে কিছুটা স্থির হতে সাহায্য করে। তাই শরীর পরিষ্কার করার অভ্যাস হঠাৎ বেড়ে গেলে আশপাশে সম্প্রতি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কিনা তা খেয়াল করা ভালো।
যদি আচরণটি খুব ঘন ঘন হতে থাকে, তাহলে শান্ত পরিবেশ, পরিচিত বিছানা, নিয়মিত খাবারের সময় এবং কোমল আচরণের মাধ্যমে বিড়ালকে আরও স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

ত্বকের অস্বস্তি পরীক্ষা করা

কখনও কখনও অতিরিক্ত শরীর পরিষ্কার করা শারীরিক অস্বস্তির ইঙ্গিত দিতে পারে। কোনো বিড়াল যদি বারবার শরীরের নির্দিষ্ট একটি অংশ চাটতে থাকে, তাহলে সেই জায়গার ত্বক ও লোম ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।
লালচে ভাব, ছোট ছোট ফুসকুড়ি, চামড়া ওঠা, লোম পাতলা হয়ে যাওয়া বা বারবার আঁচড়ানোর মতো লক্ষণ থাকলে সেখানে অস্বস্তি থাকতে পারে। পরজীবী বা অন্যান্য ত্বকের সমস্যাও কোনো নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার কারণ হতে পারে।
শুধু অভ্যাস ভেবে বিষয়টি উপেক্ষা না করে আক্রান্ত জায়গাটি আলতোভাবে পর্যবেক্ষণ করা ভালো। ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে বা অতিরিক্ত চাটা অব্যাহত থাকলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যখন অতিরিক্ত সাজসজ্জা শুরু হয়

বিড়ালের দৈনন্দিন জীবনে শরীর পরিষ্কার করা স্বাভাবিক আচরণ। তবে কোনো বিড়াল যদি অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে চাটতে থাকে, বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে বা অস্থিরভাবে পরিচর্যা করতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
অতিরিক্ত চাটার ফলে লোম পাতলা হয়ে যেতে পারে এবং ত্বকে জ্বালা তৈরি হতে পারে। তাই জোর করে আচরণটি বন্ধ করার চেষ্টা না করে প্রথমে এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা বেশি কার্যকর।
প্রতিদিনের একটি ছোট রেকর্ড রাখাও সহায়ক হতে পারে। কখন বিড়াল নিজেকে পরিষ্কার করছে, শরীরের কোন অংশে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং তার আগে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল কিনা—এসব লিখে রাখলে প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার সময় বিষয়টি বোঝানো সহজ হয়।

ঝরে পড়া লোমের সমস্যা সামলানো

শরীর পরিষ্কার করার সময় বিড়াল কিছু ঝরে পড়া লোম গিলে ফেলতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই লোম স্বাভাবিকভাবেই পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে যেসব বিড়ালের লোম বেশি ঝরে, তারা পরিচর্যার সময় তুলনামূলকভাবে বেশি লোম গিলে ফেলতে পারে।
উপযুক্ত বিরতিতে আলতো করে লোম আঁচড়ে দিলে ঝরে পড়া লোম আগেই সরিয়ে ফেলা যায়। এতে বিড়ালের গিলে ফেলা লোমের পরিমাণ কমতে পারে এবং লোমের জটও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
যদি কোনো বিড়াল বারবার কাশি বা বমি করে, খাওয়া বন্ধ করে দেয় কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখায়, তাহলে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

শরীর ঠান্ডা রাখা এবং উষ্ণ থাকা

শরীর পরিষ্কার করার অভ্যাস শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সামান্য ভূমিকা রাখতে পারে। গরম আবহাওয়ায় লোমে লাগা লালা বাষ্পীভূত হওয়ার সময় হালকা শীতল প্রভাব তৈরি করতে পারে। এটি বিড়ালের তাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ব্যবস্থার একটি ছোট অংশ।
অন্যদিকে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভালোভাবে পরিচর্যা করা লোম ত্বকের কাছাকাছি বাতাসের একটি স্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা কিছুটা তাপ নিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে ঋতু পরিবর্তনের সময় শুধু শরীর পরিষ্কার করার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। পর্যাপ্ত তাজা জল, আরামদায়ক বিশ্রামের জায়গা এবং ঘরের উপযুক্ত তাপমাত্রা নিশ্চিত করাও বিড়ালের স্বস্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের বিড়ালরা আমাদের কী বলছে

সুতরাং, প্রিয় পাঠকগণ, পরের বার যখন দেখবেন আপনার বিড়াল যত্ন করে নিজের লোম চাটছে, তখন একটু সময় নিয়ে আচরণটি লক্ষ্য করুন। হয়তো সে কেবল নিজেকে পরিষ্কার করছে, কোনো পরিবর্তনের পর স্বস্তি খুঁজছে, ত্বকের অস্বস্তি সামলাচ্ছে, মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে কিংবা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের বিড়ালের স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা রাখা। নিয়মিত শরীর পরিষ্কার করা সাধারণত সুস্থ দৈনন্দিন পরিচর্যারই অংশ। কিন্তু হঠাৎ করে এই অভ্যাস বেড়ে গেলে, কোনো নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত চাটা শুরু হলে বা ত্বক ও লোমে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি আরও মনোযোগ দিয়ে দেখা উচিত।
আমাদের বিড়ালের ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই অনেক সময় তাদের সুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। তাই তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন, পরিবর্তনগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে সময়মতো যত্ন নিন।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন