প্রাণী

সিল মাকে চিনে ফেলে?

প্রিয় পাঠকগণ! একটি ফার সিল শাবক শত শত কণ্ঠে মুখরিত ঘন প্রজনন কলোনির মধ্যেও নিজের মায়ের ডাক চিনে নিতে পারে। অ্যান্টার্কটিক ফার সিলের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, শাবকেরা মায়ের কণ্ঠস্বরের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে সেটিকে অন্য স্ত্রী সিলের ডাক থেকে আলাদা করতে শেখে।
ডাকের কম্পাঙ্ক, তার পরিবর্তনের ধরন এবং শব্দের বিস্তারের মতো বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে মিলে তৈরি করে একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের পরিচয়। চারপাশে অসংখ্য সিল একই সময়ে ডাকলেও এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো শাবককে নিজের মাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

শাবকেরা মায়ের কণ্ঠস্বরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য মনে রাখে

অ্যান্টার্কটিক ফার সিল (Arctocephalus gazella) ঘন কলোনিতে প্রজনন করে। স্ত্রী সিলেরা শাবককে দুধ খাওয়ানোর জন্য ফিরে আসার আগে নিয়মিত খাবারের সন্ধানে তীরে বা কলোনি থেকে দূরে যায়। এই সময় শাবককে অসংখ্য সিলের ভিড়ের মধ্যে নিজের মাকে শনাক্ত করতে হয়। কণ্ঠস্বর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা দূরত্ব পেরিয়েও শাবকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শাবকেরা মায়ের ডাকের শক্তি-বর্ণালী, কম্পাঙ্ক এবং শব্দের বিস্তারের পরিবর্তনের ধরন ব্যবহার করে পরিচিত কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে। এসব বৈশিষ্ট্য একত্রে প্রতিটি স্ত্রী সিলের জন্য একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের ছাপ তৈরি করে। অর্থাৎ শাবক শুধু ডাকের একটি নির্দিষ্ট শব্দ মনে রাখে না; বরং মায়ের কণ্ঠস্বরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় চিনতে শেখে।
প্লেব্যাক পরীক্ষাতেও এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মায়ের ডাকের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা বাদ দেওয়া হলে শাবকের প্রতিক্রিয়াতেও পরিবর্তন দেখা যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একাধিক ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দূরত্ব বাড়লেও ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য কাজে লাগে

এই কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশন। সহজভাবে বললে, একটি ডাকের কম্পাঙ্ক সময়ের সঙ্গে কীভাবে ওঠানামা করে, সেটিই ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশনের একটি অংশ। শব্দ কলোনির মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ার সময় এই বৈশিষ্ট্যের কিছু অংশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
অ্যান্টার্কটিক ফার সিলের শাবকদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৪ মিটার পর্যন্ত দূরত্বে ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশনের তথ্য নির্ভরযোগ্য থাকতে পারে। অন্যদিকে, প্রায় ৮ মিটারের বেশি দূরত্বে অ্যামপ্লিচিউড মডুলেশন এবং কিছু স্পেকট্রাল তথ্য তুলনামূলকভাবে দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এই পার্থক্যটি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজে বোঝায়। দূর থেকে একটি শাবক প্রথমে মায়ের ডাকের ফ্রিকোয়েন্সি প্যাটার্ন ব্যবহার করে সম্ভাব্য পরিচিত কণ্ঠস্বর শনাক্ত করতে পারে। এরপর যখন মা ও শাবক কাছাকাছি চলে আসে, তখন কণ্ঠস্বরের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আরও নির্ভুলভাবে পরিচয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

মাকে খোঁজার কাজটি যেন দুই ধাপে সম্পন্ন হয়

গবেষণার ফলাফল একটি দুই-ধাপের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্বে শাবকেরা মায়ের ডাকের ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশনের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। কাছে পৌঁছানোর পর অ্যামপ্লিচিউড মডুলেশন, শক্তি-বণ্টন এবং অন্যান্য অ্যাকোস্টিক বৈশিষ্ট্য অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহ করে।
একটি ঘন কলোনির জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। কারণ শব্দ দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং একটি শাবক তার মাকে দেখতে পাওয়ার আগেই সম্ভাব্য পরিচিত কণ্ঠস্বরের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আরও সূক্ষ্ম ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
অন্যান্য ফার সিল প্রজাতি নিয়েও গবেষণায় দেখা গেছে যে মা-শাবকের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার ক্ষমতা খুব দ্রুত বিকশিত হতে পারে। কেপ ফার সিলের ক্ষেত্রে শাবকেরা জন্মের প্রায় ৪–৬ ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের ডাক চিনতে পারে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। একইভাবে, মা সিলেরা সন্তান জন্মের প্রায় ২–৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিজের শাবকের ডাক শনাক্ত করতে সক্ষম হতে পারে।

শুধু শাবক নয়, মা-ও নিজের সন্তানকে চিনে নেয়

কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ একমুখী প্রক্রিয়া নয়। শাবক যেমন নিজের মায়ের ডাক চিনতে শেখে, তেমনি মা সিলও নিজের শাবকের কণ্ঠস্বর অন্য শাবকদের ডাক থেকে আলাদা করতে শেখে। সাব-অ্যান্টার্কটিক ফার সিলের ক্ষেত্রে মায়েরা শাবক শনাক্ত করার সময় ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশন এবং স্পেকট্রাল বৈশিষ্ট্যের মতো তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
শাবক বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ডাকের বৈশিষ্ট্যও কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে মাকে কণ্ঠস্বরের বিভিন্ন সংস্করণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই পারস্পরিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা খাবারের সন্ধান শেষে মা ও শাবকের পুনর্মিলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঘন কলোনিতে একই ধরনের অসংখ্য প্রাণী একসঙ্গে থাকার কারণে শুধু চোখের সাহায্যে সঠিক শাবক বা মা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কণ্ঠস্বর তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় সংকেত হিসেবে কাজ করে। মা ও শাবক কাছাকাছি এলে অন্যান্য ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য সেই পরিচয় আরও নিশ্চিত করে।
তাই একটি ফার সিল শাবক তার মাকে কোনো সাধারণ ডাক শুনে চিনে ফেলে না। বরং মায়ের কণ্ঠস্বরের কম্পাঙ্কের পরিবর্তন, বিস্তার, শক্তি-বণ্টন এবং অন্যান্য ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বরের ছাপ তৈরি করে। দূর থেকে ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য তাকে সম্ভাব্য মায়ের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, আর কাছাকাছি পৌঁছানোর পর অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য পরিচয় নিশ্চিত করে। হাজারো সিলের কোলাহলের মাঝেও এই অসাধারণ শ্রবণক্ষমতাই একটি ছোট শাবককে তার নিজের মাকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ দেয়।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন