প্রাণী
প্রাণীদের অদৃশ্য জিপিএস
হ্যালো, বন্ধুরা! একটি অদৃশ্য মানচিত্র পড়ে পথ খুঁজে বের করা জাদুর মতো শোনাতে পারে। অথচ অসংখ্য প্রাণী প্রতিদিন এমন একটি ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে, যা মানুষের নেই।
এই ইন্দ্রিয়ের নাম ম্যাগনেটোরিসেপশন, অর্থাৎ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে তার সাহায্যে দিক নির্ণয় করার ক্ষমতা। প্রাণীদের নেভিগেশনের জগতে এটি অন্যতম রহস্যময় এবং চমকপ্রদ ক্ষমতা।
কিছু প্রাণী কেবল চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক ব্যবহার করে নিজেদের অভিমুখ ঠিক করে, আবার পরিযায়ী প্রাণীরা আরও জটিল তথ্য কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এই ক্ষমতার অস্তিত্বের শক্ত প্রমাণ পেলেও এর পেছনে কাজ করা সুনির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি।

কোন কোন প্রাণী ম্যাগনেটোরিসেপশনের উপর নির্ভর করে?
ব্যাকটেরিয়া, কেঁচো এবং কিছু অন্ধ ছুঁচো ইঁদুরের মতো প্রাণী ম্যাগনেটোরিসেপশনের তুলনামূলক সরল রূপ ব্যবহার করতে পারে। এটি অনেকটা একটি জৈবিক কম্পাসের মতো কাজ করে। চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক সম্পর্কে তথ্য পেয়ে তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে পরিচালিত করতে পারে।
পরিযায়ী প্রজাতির ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা আরও বিস্ময়কর। প্রজাপতি, স্যামন মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে নেভিগেশনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তারা চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক এবং আনতির মতো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে দীর্ঘ পথের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে।
বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপের নেভিগেশন ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরে আকৃষ্ট করেছে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পরপরই তারা চৌম্বকীয় সংকেতের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে এবং পরবর্তীতে বিশাল সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার সময় এই তথ্যকে নেভিগেশনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
জৈবিক স্তরে আসলে কী ঘটছে?
বিজ্ঞানীরা ম্যাগনেটোরিসেপশনের সম্ভাব্য কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো একটি প্রক্রিয়াকেই সব প্রাণীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ক্রিপ্টোক্রোম তত্ত্ব: একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ক্রিপ্টোক্রোম নামের আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন। পরিযায়ী পাখির চোখে থাকা এই প্রোটিন চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এর মাধ্যমে প্রাণীটি চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক সম্পর্কে কোনো ধরনের সংবেদী তথ্য পেতে পারে।
চৌম্বকীয় খনিজ: আরেকটি তত্ত্বে ম্যাগনেটাইটের মতো চৌম্বকীয় খনিজের ক্ষুদ্র কণার কথা বলা হয়। কিছু জীবের শরীরে থাকা এই কণাগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্য করতে পারে এবং সেই পরিবর্তন থেকে স্নায়ুতন্ত্রে দিকনির্দেশক সংকেত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
কোষীয় সংকেত: কোষের ঝিল্লিতে থাকা ভোল্টেজ-সংবেদনশীল চ্যানেলও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনের ফলে কোষের ভেতরে ও বাইরে আয়নের চলাচলে পরিবর্তন ঘটলে সেটি শেষ পর্যন্ত স্নায়বিক সংকেতে রূপ নিতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাব্য রিসেপ্টরগুলো ঠিক কোথায় অবস্থিত এবং সেখান থেকে উৎপন্ন সংকেত কীভাবে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এই রহস্যময় ইন্দ্রিয়কে খুঁজে বের করা এত কঠিন কেন?
ম্যাগনেটোরিসেপশন নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, এটি দৃষ্টি বা শ্রবণের মতো সহজে শনাক্তযোগ্য কোনো অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হয় না। দৃষ্টির ক্ষেত্রে চোখ এবং শ্রবণের ক্ষেত্রে কান রয়েছে। কিন্তু চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করার জন্য প্রাণীর শরীরে একটি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অঙ্গ কোথায় রয়েছে, তা সব ক্ষেত্রে এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এই কারণে বিজ্ঞানীরা অনেক সময় সরাসরি কোনো রিসেপ্টর খুঁজে বের করার পরিবর্তে প্রাণীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এই ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করেন। পরীক্ষায় কৃত্রিমভাবে তৈরি দুর্বল চৌম্বক ক্ষেত্র পরিবর্তন করলে কোনো কোনো প্রাণীর স্বাভাবিক দিকনির্ণয় ব্যাহত হতে দেখা গেছে। এটি ম্যাগনেটোরিসেপশনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দেয়।
কিন্তু একটি ইন্দ্রিয়কে ব্যাহত করা এবং সেই ইন্দ্রিয়ের সুনির্দিষ্ট জৈবিক উৎস খুঁজে বের করা এক বিষয় নয়। এখানেই গবেষণার জটিলতা সবচেয়ে বেশি।

হয়তো একটি নয়, একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে
বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করেন, সব প্রাণীর ক্ষেত্রে একই ধরনের ম্যাগনেটোরিসেপশন ব্যবস্থা কাজ নাও করতে পারে। বরং বিভিন্ন প্রজাতি আলাদা আলাদা জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে পারে।
এমনকি একই প্রাণীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অনুযায়ী একাধিক প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। একটি ব্যবস্থা হয়তো দীর্ঘ দূরত্বের দিক নির্ণয়ে সহায়তা করছে, অন্য কোনো ব্যবস্থা স্থানীয় চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে সাহায্য করছে।
এই সম্ভাব্য বহুস্তরীয় ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কয়েক দশকের গবেষণার পরও ম্যাগনেটোরিসেপশন পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। বিজ্ঞানীরা এর প্রভাব বারবার পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন, কিন্তু সেই অসাধারণ অনুভূতির সুনির্দিষ্ট জৈবিক উৎস এখনো অনেকাংশে রহস্যই রয়ে গেছে।
পরেরবার যখন কোনো পাখিকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় একই অঞ্চলে ফিরে আসতে দেখবেন, তখন সেটিকে শুধু ভাগ্য বা অস্পষ্ট সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে ভাববেন না। তার শরীর হয়তো এমন একটি প্রকৃত সংবেদী ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যা পৃথিবীর অদৃশ্য চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশন সংকেত সংগ্রহ করে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আমরা জানি এই ক্ষমতা বাস্তব এবং বিভিন্ন প্রাণীর জীবনযাত্রায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু প্রকৃতি ঠিক কীভাবে এই অদৃশ্য কম্পাস তৈরি করেছে, সেই রহস্যের পুরো উত্তর বিজ্ঞান এখনো খুঁজে চলেছে।