উদ্ভিদ
চন্দ্রমল্লিকার যত্ন
লাইকার্স, আপনি কি কখনও ক্রিসান্থেমাম বা চন্দ্রমল্লিকা ফুলের মৌসুম শেষ হওয়ার পর ভেবে দেখেছেন, এরপর কী করা উচিত? ফুল ঝরে পড়া মানেই কিন্তু গাছটির বেড়ে ওঠার মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
সঠিকভাবে ছাঁটাই (pruning), পর্যাপ্ত আলো এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে আমরা গাছটিকে শক্তি সঞ্চয় করতে এবং পরবর্তী চক্রের জন্য নতুন কুঁড়ি বা ডগা গজাতে সাহায্য করতে পারি।
এছাড়া, সেই সুস্থ ডগাগুলো ব্যবহার করে নতুন চারাও তৈরি করা সম্ভব। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ চন্দ্রমল্লিকা গাছ থেকেই ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ফুলের বাগান গড়ে তোলা যেতে পারে।
ফুল ঝরে পড়ার পর ছাঁটাই দিয়ে শুরু করুন
ফুলগুলো শুকিয়ে বা ঝরে যাওয়ার পর পুরনো ফুলের ডাঁটাগুলো কেটে ফেলার কাজ শুরু করতে পারেন। তবে একেবারে গোড়া পর্যন্ত সবকিছু কেটে না ফেলে গোড়ার কাছাকাছি সুস্থ বৃদ্ধির লক্ষণযুক্ত (growth points) কিছু অংশ রেখে দেওয়া ভালো।
গাছটি যখন বৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করবে, তখন এই অংশগুলো থেকেই নতুন ডগা গজাতে পারে। পুরনো ডাঁটাগুলো সরিয়ে ফেললে গাছের পুষ্টি ও শক্তি অবশিষ্ট শিকড় এবং নতুন ডগাগুলোর দিকে প্রবাহিত হতে পারে। গোড়া থেকে গজানো সুস্থ নতুন ডগাগুলো রেখে দিয়ে দুর্বল বা মরে যাওয়া ডাঁটাগুলো ছেঁটে ফেলা উচিত।
ছাঁটাইয়ের সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ছাঁটাইয়ের জন্য শুষ্ক বা রৌদ্রোজ্জ্বল দিন বেছে নেওয়া ভালো, যাতে কাটা অংশগুলো দীর্ঘ সময় ভেজা না থাকে। পরিষ্কার ও ধারালো ছাঁটাইয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে কাটা অংশগুলো পরিপাটি হয় এবং কাজটিও সহজ হয়ে যায়।
নতুন ডগাগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন
পুরনো ডাঁটাগুলো ছোট করে কাটার পর গোড়ার চারপাশে নতুন ডগা গজাতে পারে। এই কচি ডগাগুলো অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ এগুলোই পরবর্তী ফুলের মৌসুমের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
নতুন গজানো সুস্থ ডগাগুলো আকারে ছোট বলে সেগুলো কেটে ফেলা উচিত নয়। বরং শুধু ক্ষতিগ্রস্ত, দুর্বল বা অতিরিক্ত ঘন হয়ে যাওয়া অংশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সরিয়ে ফেলুন এবং শক্তিশালী ডগাগুলোকে বেড়ে উঠতে দিন।
এই সময়ে পর্যাপ্ত আলো পাওয়া জরুরি। উজ্জ্বল আলো গাছকে সুগঠিত হতে এবং ভবিষ্যতে ফুল ফোটানোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি গাছের গোড়ার মাটি বা মাধ্যমটি যেন সবসময় অতিরিক্ত ভেজা বা জলমগ্ন না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
মাটির উপরিভাগ শুকিয়ে আসতে শুরু করলে তবেই জল দিন এবং অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখুন।
শুরুতেই কচি গাছগুলোর আকার ঠিক করুন
আপনি যদি বেশি সংখ্যক ফুলের ডাঁটাসহ একটি ঘন ও ঝোপালো চন্দ্রমল্লিকা গাছ পেতে চান, তাহলে শুরুর দিকেই গাছের আকৃতি ঠিক করার বিষয়টি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
যখন কোনো কচি ডগায় বেশ কয়েক জোড়া পাতা গজায়, তখন আলতো করে তার অগ্রভাগ বা ডগার মাথাটি চিমটি দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন (pinch out)। এর ফলে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় ডাঁটা অতিরিক্ত লম্বা হওয়ার পরিবর্তে পার্শ্বীয় ডগা বা শাখা গজাতে উৎসাহিত হয়।
সেই পার্শ্বীয় ডগাগুলো বড় হতে থাকলে উপযুক্ত সময়ে সেগুলোর অগ্রভাগও একইভাবে চিমটি দিয়ে ছেঁটে দেওয়া যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত গাছটিকে লম্বা ও সরু আকৃতির পরিবর্তে সুষম এবং শাখা-প্রশাখাযুক্ত একটি ঝোপালো আকৃতি দেওয়া।
একবারে খুব বেশি অংশ ছেঁটে ফেলা বা অতিরিক্ত ছাঁটাই করা উচিত নয়। ধীরে ধীরে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার ছাঁটাই করলে গাছের আকৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং প্রতিটি ছাঁটাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে গাছটি সেরে ওঠার সুযোগ পায়।

সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা
সাধারণ পরিচর্যার পাশাপাশি সঠিকভাবে ছাঁটাই করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। ক্রিসান্থেমাম বা চন্দ্রমল্লিকা গাছকে প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায় এমন জায়গায় রাখা এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ অনুযায়ী নিয়মিত জল দেওয়া প্রয়োজন।
গাছ যখন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তখন সুষম সার প্রয়োগ করলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। তবে গাছটি সদ্য ছাঁটাই করা হয়েছে বলেই অতিরিক্ত সার দেওয়া উচিত নয়। বরং সারের প্যাকেটে দেওয়া নির্দেশাবলি মেনে চলাই শ্রেয়।
গাছের চারপাশে ভালো বাতাস চলাচলও জরুরি। ডালপালা খুব ঘন হয়ে গেলে কিছু ডাল বেছে বেছে সরিয়ে দিলে গাছের মাঝখানের অংশটি ফাঁকা হয় এবং আরও বেশি পাতায় আলো পৌঁছাতে পারে।
এর ফলে গাছটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করাও সহজ হয়।
গাছ ভাগ করে নতুন চারা তৈরি (Division)
চন্দ্রমল্লিকা গাছের সংখ্যা বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হলো গাছ ভাগ করা। ফুল ফোটা শেষ হলে এবং গাছটি যখন এই ধরনের পরিচর্যার জন্য উপযুক্ত হয়, তখন সাবধানে গোড়াসহ শিকড় তুলে নতুন গজানো অংশগুলো পরীক্ষা করা যেতে পারে।
শিকড় ও নতুন কুঁড়িযুক্ত সুস্থ অংশগুলো আলাদা করে ছোট ছোট গাছে পরিণত করা সম্ভব। প্রতিটি আলাদা করা অংশে পর্যাপ্ত শিকড় থাকতে হবে, যাতে সেটি নতুন জায়গায় বেড়ে উঠতে পারে।
এরপর এই অংশগুলো নতুন ও উপযুক্ত মাটিতে বা গ্রোয়িং মিডিয়ামে রোপণ করতে হবে। শিকড় ভালোভাবে না ধরা পর্যন্ত মাটি যেন সমানভাবে আর্দ্র থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পুরোনো বা প্রতিষ্ঠিত গাছের গোড়ার চারপাশে যখন বেশ কয়েকটি সুস্থ নতুন চারা বা কুঁড়ি গজায়, তখন গাছ ভাগ করার পদ্ধতিটি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

ডাল বা কাটিং থেকে চারা তৈরি
সুস্থ ডাল থেকেও চন্দ্রমল্লিকার বংশবিস্তার করা যায়। কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা একটি সতেজ ডাল বেছে নিন এবং নিচের দিকের পাতাগুলো ফেলে দিয়ে ওপরের দিকে অল্প কিছু পাতা রেখে দিন।
এরপর ডালটির কাটা অংশ পরিষ্কার ও আর্দ্র মাটি বা গ্রোয়িং মিডিয়ামে পুঁতে দিন। এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে পর্যাপ্ত আলো আছে কিন্তু তীব্র সরাসরি সূর্যালোক পড়ে না।
মাটিতে নিয়মিত আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং ভালো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে ডালটিতে শিকড় গজাতে সুবিধা হয়। নতুন কুঁড়ি বা পাতা দেখা দিলে ধীরে ধীরে গাছটিকে আরও বেশি আলোর সংস্পর্শে আনা যেতে পারে এবং স্বাভাবিক পরিচর্যা চালিয়ে যেতে হবে।
বীজের ওপর নির্ভর না করে গাছের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।
শেষ কথা
ফুল ফোটার পর চন্দ্রমল্লিকার পরিচর্যার মূল বিষয় হলো—কোন অংশটি রেখে দিতে হবে আর কোনটি ছেঁটে ফেলতে হবে, তা জানা। পুরনো ফুলযুক্ত ডালগুলো ছোট করে কাটা, নতুন সুস্থ কুঁড়িগুলো রক্ষা করা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং নতুন গজানো অংশগুলোর আকৃতি ধীরে ধীরে ঠিক করার মাধ্যমে গাছকে আরও ভালোভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা যায়।
এছাড়া গাছ ভাগ করা এবং ডাল বা কাটিং থেকে চারা তৈরির মাধ্যমে একটি সুস্থ গাছ থেকেই নতুন গাছ তৈরি করা সম্ভব।
আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো—ফুল ফোটা শেষ হয়ে গেলেও গাছের কাজ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বরং এরপরও তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। সামান্য যত্নসহকারে ছাঁটাই এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে চন্দ্রমল্লিকা গাছকে নতুন করে বেড়ে ওঠার জন্য এবং আরও একটি সুন্দর ফুলের মৌসুমের জন্য প্রস্তুত করে তোলা সম্ভব।