উদ্ভিদ

বারান্দায় কোন গাছ ভালো!

প্রিয় পাঠক, বারান্দা হতে পারে গাছ সাজানোর এক স্বপ্নের মতো সুন্দর জায়গা। তবে বারান্দাটি কোন দিকে মুখ করে আছে, সেটিই মূলত ঠিক করে দেয় সেখানে কেমন আলো, তাপ ও বাতাস পাওয়া যাবে।
বিষয়টি ঠিকভাবে খেয়াল না করলে একটি সুন্দর গাছও এমন বেহাল দশায় পড়তে পারে, যেন সে কয়েকবার অ্যালার্ম শুনেও ঘুম থেকে ওঠেনি আর চুলও কাটায়নি!
মূল বিষয়টি খুবই সহজ। বারান্দার দিকভেদে আলো, তাপ ও বাতাসের পরিমাণ এবং ধরন ভিন্ন হয়। তাই কেবল পছন্দের ভিত্তিতে গাছ না বেছে বারান্দার পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই গাছ নির্বাচন করা উচিত। রৌদ্রোজ্জ্বল বারান্দা আর ছায়াময় বারান্দা এক নয়। আবার বাতাস চলাচলের সুবিধাযুক্ত কোণ এবং বাতাস থেকে আড়াল করা জায়গার পরিবেশেও যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। বারান্দার স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই গাছ বেছে নিলে আপনার এবং আপনার সবুজ সঙ্গীদের—উভয়ের জীবনই অনেক সহজ হয়ে যায়।

দক্ষিণমুখী বারান্দা

দক্ষিণমুখী বারান্দায় সাধারণত দিনের বেশিরভাগ সময়জুড়ে কড়া রোদ বা তীব্র আলো পাওয়া যায়। এর অর্থ হলো জায়গাটি বেশ উজ্জ্বল, উষ্ণ এবং প্রায়শই শুষ্ক থাকে। বিশেষ করে টবের ক্ষেত্রে মাটি থেকে দ্রুত আর্দ্রতা বা পানি শুকিয়ে যেতে পারে। তাই তীব্র আলো ও কিছুটা তাপ সহ্য করতে পারে—এমন রোদপছন্দকারী গাছের জন্য এই জায়গা উপযুক্ত। ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, থাইম, জেরেনিয়াম, পেটুনিয়া, সাকুলেন্ট এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাস বা ফণীমনসা গাছ এখানে ভালো মানিয়ে নিতে পারে।
এই গাছগুলো সাধারণত কড়া আলো পছন্দ করে এবং প্রচণ্ড রোদে বারান্দাটি যখন অনেকটা খোলা আকাশের নিচে রাখা ‘টোস্টার’-এর মতো গরম হয়ে ওঠে, তখনও এগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। তবে গরম বারান্দায় রাখা টবের মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, তাই নিয়মিত পানি দেওয়া জরুরি। টবের নিচে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকা আবশ্যক। মাটির ওপর মালচিং বা আচ্ছাদনের একটি স্তর থাকলে সেটিও আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

পূর্বমুখী বারান্দা

পূর্বমুখী বারান্দায় সাধারণত সকালের মৃদু আলো পাওয়া যায় এবং দিনের পরবর্তী সময়ে পরিবেশ অপেক্ষাকৃত শীতল ও ছায়াময় থাকে। এটি গাছপালার জন্য একটি অত্যন্ত আরামদায়ক ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ—ঠিক যেন কোনো মনোরম ক্যাফের জানালার পাশের সিট!
যেসব গাছ উজ্জ্বল আলো পছন্দ করে কিন্তু প্রখর বা দহনকারী রোদ সহ্য করতে পারে না, সেগুলো এখানে ভালো বেড়ে ওঠে। ফুশিয়া, বেগোনিয়া, ইম্পেশেন্স, পার্সলে ও চাইভসের মতো ভেষজ উদ্ভিদ এবং অনেক ধরনের পাতা-প্রধান ইনডোর প্ল্যান্ট এই পরিবেশে বেশ ভালো থাকে।
সকালের রোদ সাধারণত গাছের কোমল পাতার জন্য তুলনামূলকভাবে সহনীয়। তাই দীর্ঘ সময় ধরে বিকেলের কড়া রোদের ধকল ছাড়াই যেসব গাছের আলো প্রয়োজন, তাদের জন্য পূর্বমুখী বারান্দা বেশ উপযোগী। দক্ষিণমুখী বারান্দার তুলনায় এখানে সাধারণত কম পানি দিলেও চলে, তবে টবের মাটির অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

পশ্চিমমুখী বারান্দা

পশ্চিমমুখী বারান্দায় প্রায়শই বিকেল ও সন্ধ্যার কড়া রোদ এসে পড়ে, যা অনেক সময় আশ্চর্যজনকভাবে তীব্র হতে পারে। এখানকার আলো কিছুটা দেরিতে পৌঁছালেও তাপের তীব্রতা বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ায় দেয়াল ও মেঝে থেকে তাপ প্রতিফলিত হয়ে গাছের ওপর পড়তে পারে।
তাই পশ্চিমমুখী বারান্দা এমন সব গাছের জন্য উপযুক্ত, যেগুলো উজ্জ্বল আলো পছন্দ করে এবং বিকেলের কড়া রোদ বা তাপ সহ্য করতে পারে। ডেইজি, গাঁদা, সালভিয়া, জেরেনিয়াম এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু ভেষজ উদ্ভিদ বা হার্বস এ ক্ষেত্রে ভালো পছন্দ হতে পারে।
যদি বারান্দায় অতিরিক্ত গরম অনুভূত হয়, তবে মোটা পাতাযুক্ত বা খরা-সহনশীল গাছগুলো ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। টবগুলোকে কাছাকাছি বা একত্রে রাখলে সেগুলো কিছুটা আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে এবং গাছের চারপাশে তুলনামূলকভাবে শীতল ও আরামদায়ক পরিবেশ বা ‘মাইক্রোক্লাইমেট’ তৈরি হতে পারে।

উত্তরমুখী বারান্দা

উত্তরমুখী বারান্দায় সাধারণত সরাসরি সূর্যালোক সবচেয়ে কম পড়ে। তাই দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল আলো প্রয়োজন এমন গাছের তুলনায় ছায়া-সহনশীল গাছ এখানে ভালো জন্মে। অনেকেই এই জায়গাতেই ভুল করেন। রোদপছন্দকারী গাছকে অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণায় রেখে ভালো ফলাফলের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
ফার্ন, হোস্টা, আইভি, ক্যালাডিয়াম এবং কিছু প্রজাতির বেগোনিয়া এই পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে। বড় ও জমকালো ফুলের গাছের পরিবর্তে সুন্দর পাতার জন্য পরিচিত গাছগুলো এখানে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পছন্দ হতে পারে।
কম আলোর কারণে মাটি শুকাতে দেরি হয়। তাই পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। দিনের বেশিরভাগ সময় বারান্দা শীতল ও ছায়াময় থাকলে অতিরিক্ত পানি দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আরও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন

বারান্দার দিক বা অবস্থান একটি বড় নির্দেশক হলেও এটিই একমাত্র বিষয় নয়। বাতাস বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে ওপরের তলার বারান্দায়। প্রবল বাতাস দ্রুত মাটি শুকিয়ে ফেলতে পারে এবং গাছের নরম কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আশপাশের ভবন সূর্যালোক আটকে দিতে পারে, আবার প্রতিফলক দেয়াল তাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। রেলিং, শেড (awning) এবং কাচের বেষ্টনীও গাছের ওপর পড়া আলোর পরিমাণ ও তীব্রতা পরিবর্তন করতে পারে।
কিছু কেনার আগে কয়েক দিন বারান্দাটি পর্যবেক্ষণ করা এবং সেখানে দিনের কোন সময়ে কতক্ষণ রোদ থাকে, তা খেয়াল করা ভালো। কাগজে-কলমে হয়তো কোনো বারান্দাকে রৌদ্রোজ্জ্বল মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সেখানে আংশিক ছায়া থাকতে পারে।
বারান্দার দিক অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করা মানে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা—ছায়াপছন্দকারী গাছকে জোর করে সারাদিন রোদে রাখার চেষ্টা করা নয়। আলো ও তাপের মাত্রা এবং বাতাসের গতিবিধি খেয়াল করুন। পরিবেশের সঙ্গে লড়াই না করে সেই স্থানের উপযোগী গাছ বেছে নিন।
এমনটা করলে আপনার বারান্দাটি কোনো জটিল বাগান সমস্যার জায়গা না হয়ে বরং একটি মনোরম, সতেজ ও সবুজ কোণে পরিণত হওয়ার দারুণ সুযোগ পাবে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন