উদ্ভিদ

ওরিয়েন্টাল লিলি

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন একটি ওরিয়েন্টাল লিলি তার প্রথম ফুলটি মেলে ধরে এবং এর সুবাসে পুরো ঘর ভরে ওঠে।
এদের ফুল বেশ আকর্ষণীয় ও বড়—প্রায় ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হতে পারে—এবং অনেক জাতের ফুল ট্রাম্পেট বা শিঙার মতো আকৃতির হয়। সাদা, গাঢ় গোলাপি, টকটকে লাল কিংবা মিশ্র রঙের এসব ফুল সহজেই সবার নজর কাড়ে।
তবে এদের প্রয়োজনীয়তাগুলো একবার বুঝে গেলে ওরিয়েন্টাল লিলি বেড়ে তোলা ও যত্ন নেওয়া অবাক করার মতোই সহজ।

ওরিয়েন্টাল লিলির বিশেষত্ব

ওরিয়েন্টাল লিলি হলো ‘লিলিয়াম’ (Lilium) গণের অন্তর্ভুক্ত প্রকৃত লিলি। এগুলো মূলত Lilium auratum এবং Lilium speciosum-এর সংকরায়ণের মাধ্যমে তৈরি। লিলি প্রজাতির মধ্যে এগুলো অন্যতম লম্বা ও দৃষ্টিনন্দন। জাতভেদে এদের উচ্চতা ৩ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।
জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে স্টারগেজার (Stargazer), কাসা ব্লাঙ্কা (Casa Blanca), মাসকাডেট (Muscadet), সোরবোন (Sorbonne) ইত্যাদি। এগুলো সাধারণত ৪ থেকে ৮ নম্বর হার্ডিনেস জোনে (hardiness zones) ভালো জন্মে। তবে সামান্য বাড়তি যত্ন নিলে ৩ থেকে ৯ নম্বর জোনেও এগুলো সফলভাবে ফলানো সম্ভব।
এদের সুবাসই ওরিয়েন্টাল লিলিকে আরও অনন্য করে তোলে। একটি মাত্র ফুলও পুরো ঘর সুগন্ধে ভরিয়ে দিতে পারে। তবে ঘরের ভেতরে এই সুবাস অনেকের কাছে বেশ তীব্র মনে হতে পারে। তাই কেউ কেউ ফুলের পরাগদণ্ড (stamens) কেটে ফেলেন অথবা ফুলগুলো অন্য কোনো ঘরে সরিয়ে রাখেন।

মাটি ও স্থান নির্বাচন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। জমে থাকা পানি বা অতিরিক্ত স্যাঁতসেঁতে মাটি লিলির কন্দ (bulb) পচিয়ে নষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ। ৬.০ থেকে ৬.৫ পিএইচ (pH) মাত্রার সুনিষ্কাশিত দোআঁশ বা বেলে মাটি এদের জন্য আদর্শ।
ভারী এঁটেল মাটি এড়িয়ে চলাই ভালো। তবে এমন মাটিই ব্যবহার করতে হলে পার্লাইট, মোটা বালু বা কম্পোস্ট মিশিয়ে এর পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে হবে।
এমন স্থান নির্বাচন করুন, যেখানে গাছের গোড়া বা শিকড় ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত পরিবেশে থাকবে, কিন্তু পাতা ও ফুল পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাবে—দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। বাড়ির দেয়ালের কাছে পশ্চিমমুখী স্থানে গাছ লাগানো প্রায়ই ভালো ফল দেয়। এতে বিকেলের পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া যায়, আবার দিনের শেষভাগের অতিরিক্ত তাপ থেকেও কিছুটা সুরক্ষা মেলে।
এ ছাড়া জোরালো বাতাস থেকে গাছটিকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও করা উচিত। কারণ লম্বা কাণ্ডগুলো কোনো অবলম্বন ছাড়া থাকলে সহজেই ভেঙে যেতে পারে।

কন্দ রোপণ

শরৎকালে বা বসন্তের শুরুতে কন্দগুলো রোপণ করুন। কন্দের নিচের অংশ থেকে মাটির উপরিভাগ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় এগুলো পুঁততে হবে। কন্দের সরু বা সূঁচালো অংশটি অবশ্যই উপরের দিকে রাখতে হবে।
কন্দগুলোর মধ্যে প্রায় ১২ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখুন। শিকড়ের ভালো বিকাশের জন্য রোপণের আগে মাটি ১২ ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত আলগা বা ঝুরঝুরে করে নিন এবং এতে কম্পোস্ট বা পুরোনো জৈব সার মিশিয়ে দিন।
রোপণের পর মাটি ভালোভাবে বসিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচুর পানি দিন। শীতপ্রধান অঞ্চলে শীতকালে বাল্ব বা কন্দগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে এবং মাটির তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে রোপণ এলাকার ওপর ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পুরু মালচ (আবরণ) দিন।

পানি ও সার প্রয়োগ

গাছের বৃদ্ধির মৌসুমে সপ্তাহে এক বা দুবার ভালোভাবে পানি দিন। লক্ষ্য রাখবেন, যেন সপ্তাহে মোট প্রায় ১ ইঞ্চি পরিমাণ পানি দেওয়া হয়। সকালে পানি দেওয়া সবচেয়ে ভালো। এতে দিনের মধ্যেই গাছের পাতা শুকিয়ে যায় এবং ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি কমে।
যথাসম্ভব ওপর থেকে পানি দেওয়া (overhead watering) এড়িয়ে চলুন। বরং গাছের গোড়ায় পানি দেওয়াই ভালো।
সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে, গাছের অঙ্গজ বৃদ্ধির সময় প্রতি মাসে সুষম বা ব্যালান্সড ফর্মুলার (১০-১০-১০) সার ব্যবহার করুন। কুঁড়ি আসার পর ফুল ফোটাতে সহায়তা করে এমন উচ্চ ফসফরাসযুক্ত সার (৫-১০-১০) ব্যবহার শুরু করুন।
উচ্চ নাইট্রোজেনযুক্ত সার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো ফুলের বদলে পাতার বৃদ্ধিকে বেশি ত্বরান্বিত করে। ফুল ফুটে গেলে সার দেওয়া বন্ধ করুন।

ফুল ফোটার পরবর্তী যত্ন ও পোকামাকড় দমন

ফুল ঝরে যাওয়ার পর শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলো কেটে ফেলুন (ডেডহেডিং)। তবে কাণ্ড ও পাতাগুলো পুরোপুরি অক্ষত রাখুন। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য তৈরি এবং পরবর্তী বছরের জন্য বাল্ব বা কন্দকে পুষ্ট করার জন্য গাছের পাতার প্রয়োজন হয়। তাই খুব তাড়াতাড়ি পাতা কেটে ফেললে বাল্বটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
পাতাগুলো প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে মরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সাধারণত ফুল ফোটার পর এর জন্য ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগে।
এক্ষেত্রে প্রধান ক্ষতিকর পোকা হলো ‘রেড লিলি লিফ বিটল’। এটি উজ্জ্বল লাল রঙের এক ধরনের পোকা, যা লিলির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। পূর্ণবয়স্ক পোকা ও লার্ভা দেখা মাত্রই হাত দিয়ে তুলে ফেলুন অথবা বসন্তের শুরুতে হর্টিকালচারাল অয়েল (horticultural oil) প্রয়োগ করুন।
আর্দ্র বা ভেজা আবহাওয়ায় ‘বোট্রিটিস ব্লাইট’ (এক ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ) দেখা দিতে পারে। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাছের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন এবং ওপর থেকে পানি দেওয়া এড়িয়ে চলুন।
ফুল কেটে সাজানোর জন্য খুব সকালে কাণ্ডগুলো সংগ্রহ করুন, যখন নিচের দিকের কুঁড়িগুলো সবেমাত্র ফুটতে শুরু করেছে। ফুলদানিতে পানির নিচে ডুবে থাকবে এমন পাতাগুলো ফেলে দিন। প্রতি ২-৩ দিন অন্তর পানি পরিবর্তন করুন এবং প্রতিবার পানি বদলানোর সময় কাণ্ডের নিচের অংশ পুনরায় কিছুটা কেটে নিন।
সঠিকভাবে যত্ন নিলে কেটে রাখা ওরিয়েন্টাল লিলির ফুলের তোড়া অনায়াসেই ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকতে পারে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন