উদ্ভিদ

উদ্ভিদ নতুন জীবন শুরু করে

প্রিয় পাঠক, বৃষ্টির পর ছোট একটি বীজের অঙ্কুরোদগম, পানিতে রাখা কাণ্ডে শিকড় গজানো কিংবা মাটির নিচে সুপ্ত কন্দের জেগে ওঠা—উদ্ভিদের নতুন করে জীবন শুরুর কতই না বিস্ময়কর উপায় রয়েছে!
উদ্ভিদ কীভাবে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে—এমন প্রশ্ন যদি আপনার মনে কখনো জেগে থাকে, তবে জেনে রাখুন, তারা মূলত দুটি প্রধান উপায়ে তা করে: বীজ এবং অঙ্গজ প্রজনন (vegetative methods) পদ্ধতির মাধ্যমে।
কিছু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ফুল, পরাগরেণু এবং বীজ গঠনের প্রয়োজন হয়। আবার অন্য কিছু উদ্ভিদ কাণ্ড, শিকড় বা পাতা থেকেও সম্পূর্ণ নতুন একটি উদ্ভিদে পরিণত হতে পারে। প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব ছন্দ রয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে এগুলো উদ্ভিদকে ছড়িয়ে পড়তে, টিকে থাকতে ও বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করে।

বীজের মাধ্যমে প্রজনন

বীজের মাধ্যমে প্রজনন হলো সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি। সপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পরাগায়নের মাধ্যমে পরাগরেণু ফুলের স্ত্রী-অংশে পৌঁছায়। নিষিক্তকরণের পর উদ্ভিদ বীজ তৈরি করে, যা প্রায়শই ফলের ভেতরে থাকে।
প্রতিটি বীজের ভেতরে একটি ভ্রূণ ও সঞ্চিত খাদ্য থাকে, যা প্রাথমিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অনুকূল পরিবেশে—সাধারণত পর্যাপ্ত আর্দ্রতা, উষ্ণতা ও বাতাস পেলে—বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটে। প্রথমে একটি শিকড় বেরিয়ে আসে এবং এরপর কাণ্ড বা অঙ্কুর আলোর দিকে ওপরের দিকে বাড়তে থাকে।
বীজ উদ্ভিদকে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে, কারণ এগুলো বাতাস, পানি বা প্রাণীর মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাতে পারে। এই পদ্ধতিতে জিনগত বৈচিত্র্যও তৈরি হয়। অর্থাৎ, নতুন উদ্ভিদগুলো হুবহু মাতৃ-উদ্ভিদের মতো হয় না।

রেণুর (Spore) মাধ্যমে প্রজনন

সব উদ্ভিদ প্রজননের জন্য বীজের ওপর নির্ভর করে না। মস (moss) এবং ফার্ন (fern) জাতীয় উদ্ভিদ রেণুর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে। রেণু হলো প্রজননক্ষম অতি ক্ষুদ্র একক, যা অনুকূল পরিবেশে নতুন উদ্ভিদে পরিণত হতে পারে।
এগুলো বীজের তুলনায় অনেক ছোট এবং এদের মধ্যে বীজের মতো সঞ্চিত খাদ্যভাণ্ডার থাকে না। রেণু উৎপাদনকারী অনেক উদ্ভিদের জীবনচক্রে পর্যায়ক্রমিক ধাপ থাকে—একটি ধাপে রেণু উৎপন্ন হয় এবং অন্য ধাপে প্রজনন কোষ তৈরি হয়।
এই প্রক্রিয়াটি শুরুতে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। তবে আর্দ্র বনভূমি, পাথর এবং বাগানের বিভিন্ন কোণে এই উদ্ভিদগুলোর টিকে থাকার ক্ষেত্রে এটিই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

কাটিং বা কলম (Cuttings)

কাটিং বা কলম পদ্ধতি অঙ্গজ প্রজননের অন্যতম সাধারণ একটি উপায়। সহজ ও নির্ভরযোগ্য হওয়ার কারণে মালি বা বাগানপ্রেমীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
মাতৃ-উদ্ভিদ থেকে কাণ্ড, পাতা বা শিকড়ের একটি অংশ কেটে নিয়ে পানি অথবা আর্দ্র কোনো মাধ্যমে—যেমন ভেজা মাটি বা বালিতে—রাখা হয়। উদ্ভিদটি যদি উপযুক্ত প্রজাতির হয়, তবে নতুন শিকড় ও অঙ্কুর গজায় এবং সেই কাটা অংশটি ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র উদ্ভিদে পরিণত হয়।
ঘরের ভেতরের গাছ (houseplants) এবং বাগানের অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে কাণ্ড থেকে কলম করার পদ্ধতিটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। যেহেতু নতুন উদ্ভিদটি সরাসরি মাতৃ-উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়, তাই জিনগতভাবে এটি প্রায় হুবহু একই রকম হয়ে থাকে। কোনো উদ্ভিদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো একইভাবে বজায় রাখতে চাইলে এই পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর।

বিভাজন, রানার এবং বাল্ব

অনেক উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে বিভক্ত হয়ে বা ছড়িয়ে পড়ে বংশবৃদ্ধি করে। ‘বিভাজন’ (division) প্রক্রিয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়—যার প্রতিটিতেই শিকড় ও কাণ্ড বা অঙ্কুর থাকে—এবং প্রতিটি অংশ স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
‘রানার’ (runners) হলো লম্বা ও অনুভূমিক কাণ্ড, যা মাটির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর পর্ব বা গাঁট (nodes) থেকে নতুন উদ্ভিদের জন্ম দেয়।
বাল্ব (bulbs), টিউবার (tubers), রাইজোম (rhizomes) এবং কর্ম (corms) হলো মাটির নিচে থাকা এমন এক ধরনের অংশ, যা খাদ্য সঞ্চয় করে এবং নতুন অঙ্কুর গজাতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে উদ্ভিদ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় দক্ষতার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতের বৃদ্ধির জন্য শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পারে।
মালি বা বাগানীরা প্রায়ই বিভাজন এবং বাল্ব রোপণের পদ্ধতি ব্যবহার করেন, কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও সুবিধাজনক।

লেয়ারিং এবং গ্রাফটিং

‘লেয়ারিং’ (layering) হলো অঙ্গজ প্রজননের আরেকটি পদ্ধতি, যেখানে মূল উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় কোনো কাণ্ডকে মাটির দিকে বাঁকিয়ে বা উপযুক্ত কোনো মাধ্যমে—যেমন মাটি বা কম্পোস্টে—ঢেকে দেওয়া হয়। শিকড় গজানোর পর সেই নতুন অংশটিকে মূল উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে অন্য কোথাও রোপণ করা যায়।
‘গ্রাফটিং’ (grafting) বা জোড়কলমের পদ্ধতিটি কিছুটা ভিন্ন। এতে দুটি ভিন্ন উদ্ভিদের টিস্যু বা কলাকে এমনভাবে যুক্ত করা হয়, যাতে তারা পরবর্তীতে একটি উদ্ভিদ হিসেবেই বেড়ে ওঠে।
সাধারণত ওপরের অংশটি ফল বা ফুলের গুণমানের জন্য নির্বাচন করা হয়, আর নিচের অংশটি একটি শক্তিশালী মূলতন্ত্র বা শিকড়ের কাঠামো প্রদান করে। উদ্যানপালনে উপকারী বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয় ঘটাতে এবং সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গ্রাফটিং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
উদ্ভিদ আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি উপায়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, আর এই বিষয়টিই তাদের এত আকর্ষণীয় করে তোলে। বীজ বৈচিত্র্য ও ব্যাপক বিস্তারের সুযোগ করে দেয়; অন্যদিকে কাটিং (ডাল কেটে চারা তৈরি) এবং অন্যান্য অঙ্গজ প্রজনন পদ্ধতিগুলো সুনিশ্চিত ও প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়ার সুযোগ দেয়।
আপনি যদি বাড়িতে গাছের যত্ন নিয়ে থাকেন, তবে এই পদ্ধতিগুলো জানা থাকলে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন চারা তৈরি করতে পারবেন। এটি এমন এক চমৎকার বিষয়, যা মনে করিয়ে দেয়—নতুন করে শুরু করার জন্য প্রকৃতির হাতে সবসময়ই একাধিক উপায় রয়েছে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন