উদ্ভিদ

ঘরে সূর্যের আলো ঢোকে না?

বন্ধুরা, কেমন আছেন? আপনার অ্যাপার্টমেন্টে হয়তো আলমারির ভেতরের মতোই খুব কম সূর্যালোক পৌঁছায়, তবুও আপনি চান সেখানে সতেজ ও প্রাণবন্ত গাছ থাকুক।
বিষয়টি অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত। কম আলোযুক্ত জায়গায় বসবাস করা অনেকটা গুহার ভেতর সমুদ্রতীরের পার্টির (বিচ পার্টি) আয়োজন করার চেষ্টা করার মতো মনে হতে পারে।
তবে সুখবর হলো, এমন অনেক গাছ রয়েছে যেগুলো কম আলোর পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্যই উপযুক্ত। আর কিছু কৌশলী পদক্ষেপ নিলে এগুলোকে এমনভাবে সাজিয়ে রাখতে পারেন, যেন মনে হবে কোনো ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকেই উঠে এসেছে।

সঠিক গাছটি বেছে নিন

কম আলোয় বেড়ে ওঠা ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরের ভেতরের গাছগুলো ছায়াযুক্ত স্থান, পরোক্ষ সূর্যালোক কিংবা কম প্রাকৃতিক আলোযুক্ত ঘরেও টিকে থাকতে পারে। এরা যেন উদ্ভিদ জগতের অন্তর্মুখী (introvert) সদস্য—ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এদের কোনো ‘স্পটলাইট’ বা তীব্র আলোর প্রয়োজন হয় না। এদের অনেকেরই আদি নিবাস গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্টের নিচের স্তরে, যেখানে বড় গাছের আড়ালে তুলনামূলক কম আলো পৌঁছায়। তাই কম আলোয় মানিয়ে নেওয়া এদের সহজাত বৈশিষ্ট্যের অংশ।
এর ভালো উদাহরণ হলো স্নেক প্ল্যান্ট, জিজি (ZZ) প্ল্যান্ট, পোথোস, পিস লিলি এবং কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট। স্নেক প্ল্যান্ট ও জিজি প্ল্যান্ট অত্যন্ত সহনশীল; পোথোস সহজে বেড়ে ওঠে এবং লতানো স্বভাবের; পিস লিলি চকচকে পাতা ও সাদা ফুলের সৌন্দর্য যোগ করে; আর কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট অত্যন্ত শক্তপোক্ত এবং টিকে থাকার ক্ষমতায় অনন্য।

গাঢ় সবুজ পাতার গাছ বেছে নিন

কম আলোয় মানিয়ে নিতে পারে এমন গাছ কেনার সময় গোয়েন্দার মতো পাতার রঙের দিকে খেয়াল রাখুন। এমন পাতাযুক্ত গাছ বেছে নিন, যা কম আলোতেও ভালোভাবে বেড়ে ওঠার সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। গাঢ় সবুজ পাতার গাছে সাধারণত ক্লোরোফিলের পরিমাণ বেশি থাকে, যা কম আলোতেও আলো শোষণে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, বিচিত্র রঙের (variegated) বা খুব হালকা রঙের পাতাযুক্ত গাছগুলোর অনেক সময় তুলনামূলক বেশি আলোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই ঘরের সবচেয়ে অন্ধকার কোণের জন্য এ ধরনের গাছ বেছে না নিয়ে কম আলো সহ্য করতে পারে এমন প্রজাতি নির্বাচন করাই ভালো।

ধারণার চেয়ে কম পানি দিন

কম আলোয় বেড়ে ওঠা গাছের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পানি দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। কারণ কম আলোতে অনেক গাছ তুলনামূলক ধীরগতিতে পানি ব্যবহার করে। দুইবার পানি দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে মাটি কিছুটা শুকিয়ে যেতে দিন এবং আঙুল দিয়ে মাটির ওপরের এক ইঞ্চি অংশ পরীক্ষা করুন। মাটি শুকনো মনে হলেই প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিন।
হালকা গরম বা ঘরের তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করা ভালো। খুব ঠান্ডা পানি কিছু গাছের শিকড়ে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিষয়টিকে এভাবে ভাবুন—একবারে গাছের টব ভরে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন বুঝে ধীরে ধীরে পানি দেওয়া হচ্ছে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশের মতো আর্দ্রতা বজায় রাখুন

কম আলোয় বেড়ে ওঠা অনেক গাছেরই আদি নিবাস গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলের নিচের স্তরে, যেখানে বড় গাছের ছায়ার পাশাপাশি বাতাসে তুলনামূলক বেশি আর্দ্রতা থাকে। শীতকালে সাধারণ বসার ঘরের বাতাস অনেক সময় বেশ শুষ্ক হয়ে যায়, যা এসব গাছের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়।
নিয়মিত পানি স্প্রে করে (মিস্টিং), হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করে কিংবা গাছের পাশে পানির পাত্র রেখে আপনি আশপাশের আর্দ্রতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। এতে গাছগুলো এমন পরিবেশ পেতে পারে, যা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের তুলনায় কিছুটা বেশি উপযোগী।

কৃত্রিম আলোকে আপনার গোপন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুন

ঘরে জানালা নেই? তাতেও কোনো সমস্যা নেই। শীতের ছোট দিনগুলোতে ‘গ্রো লাইট’ (উদ্ভিদের জন্য বিশেষ কৃত্রিম আলো) দারুণ কাজে আসতে পারে এবং গাছ প্রয়োজনীয় আলো পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে ঘরের অন্যান্য আলোর উৎসের কথাও ভুলে যাবেন না। আলো কেবল জানালা দিয়েই আসে না।
দেয়াল থেকে প্রতিফলিত আলো, ল্যাম্পের কৃত্রিম আলো, এমনকি খোলা দরজা বা হলওয়ে থেকে আসা আলোও ঘরের আলোর সামগ্রিক পরিবেশে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ঘরের বিভিন্ন স্থানে গাছ রেখে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন কোন জায়গায় গাছ সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে উঠছে।

পরিমিত ও বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে সার প্রয়োগ করুন

উজ্জ্বল আলো পাওয়া গাছের তুলনায় কম আলোতে থাকা গাছের জন্য অনেক সময় কম সারই যথেষ্ট হয়। তবে গাছের সক্রিয় বৃদ্ধির মৌসুমে নিয়মিত অল্প পরিমাণে সার প্রয়োগ করলে সেগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে। গাছের বেড়ে ওঠার মৌসুমে প্রতি ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ অন্তর ‘ব্যালেন্সড লিকুইড হাউসপ্ল্যান্ট ফার্টিলাইজার’ (ভারসাম্যপূর্ণ তরল সার) স্বাভাবিক মাত্রার অর্ধেক পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
শরৎ ও শীতকালে সার প্রয়োগ কমিয়ে দিন এবং অতিরিক্ত সার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। অতিরিক্ত সার মাটিতে লবণ জমার কারণ হতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে গাছের শিকড়ের ক্ষতি করতে পারে।

ছাঁটাই, পরিষ্কার ও স্থান পরিবর্তন

হলুদ বা মরা পাতাগুলো ছেঁটে ফেলুন, যাতে গাছ তার শক্তি সুস্থ অংশের বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে পারে। পাতার ওপর ধুলো জমে থাকলে সেগুলোও আলতোভাবে পরিষ্কার করুন, যাতে পাতার পৃষ্ঠে আলো পৌঁছাতে সুবিধা হয়।
যদি দেখেন গাছটি অস্বাভাবিকভাবে লম্বা হয়ে যাচ্ছে বা পাতার রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, তবে সেটিকে জানালার কাছে কিংবা তুলনামূলক বেশি আলোযুক্ত কোনো স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করুন।
কম আলোর গাছের যত্নের মূল বিষয়গুলো হলো সঠিক প্রজাতির গাছ নির্বাচন করা, সতর্কতার সঙ্গে পানি দেওয়া, উপযুক্ত আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং ঘরে থাকা আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। সঠিক পরিচর্যা পেলে কম আলোযুক্ত ঘরও হয়ে উঠতে পারে একটি সতেজ ও স্বাস্থ্যকর ইনডোর জঙ্গল।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন