উদ্ভিদ

ইনডোর প্ল্যান্ট সাজ!

প্রিয় পাঠক, ঘরের সাজসজ্জায় নতুন কুশন বা অন্যান্য অনুষঙ্গের চেয়ে ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরের ভেতরের গাছ অনেক দ্রুত ও সহজেই পরিবেশে পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে গাছগুলোকে কেবল একটি কোণে জড়ো করে রাখলেই যে জাদুকরী কোনো আবহ তৈরি হবে, তা নয়। গাছ সাজানোর বিষয়টি অনেকটা পোশাক নির্বাচনের মতো—বাইরে থেকে সহজ-সরল মনে হলেও এর পেছনে বেশ কিছুটা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে আকার, আকৃতি, রঙ এবং অবস্থানের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটানো জরুরি।
গাছগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার অন্যতম সহজ উপায় হলো তাদের আকৃতি ও গড়নে বৈচিত্র্য রাখা। রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (RHS)-এর মতে, ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির গাছ দৃষ্টিকে বেশি আকর্ষণ করে। যেমন—লম্বা ও সোজা হয়ে বেড়ে ওঠা গাছের পাশে লতানো গাছ খুব ভালো মানায়। আবার গোলাকার ও ঘন পাতার গাছ আশপাশের কঠোর বা সোজা রেখাগুলোকে আরও কোমল ও নমনীয় করে তুলতে পারে।
সব গাছের আকৃতি বা গড়ন যদি একই রকম হয়, তাহলে পুরো সাজসজ্জাটি একঘেয়ে বা প্রাণহীন মনে হতে পারে—ঠিক যেন কোনো গায়কদলের সবাই একই সুরে গান গাইছে। বিভিন্ন আকৃতির গাছের সংমিশ্রণ প্রতিটি গাছকে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলে। ফলে গাছগুলো কেবল সবুজ পাতার জগাখিচুড়ি বা ভিড়ের মতো না দেখে একটি পরিকল্পিত আয়োজন বলে মনে হয়।

আকার ও উচ্চতার সমন্বয়

একটি সুন্দর সাজসজ্জায় সাধারণত বিভিন্ন উচ্চতার গাছের সমাবেশ থাকে। লম্বা গাছগুলো পেছনে বা মেঝেতে রাখা যেতে পারে, মাঝারি আকারের গাছগুলো টেবিল বা স্ট্যান্ডের ওপর সাজানো যায় এবং ছোট গাছগুলো এমন জায়গায় রাখা ভালো, যেখানে সেগুলো সহজেই চোখে পড়ে এবং অন্য গাছের আড়ালে হারিয়ে যায় না। উচ্চতার এই তারতম্য বা স্তরবিন্যাস সাজসজ্জায় গভীরতা তৈরি করে এবং ঘরের ভেতর দৃষ্টিকে স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে সাহায্য করে।
লতানো গাছগুলো তাক বা ঝুলন্ত স্থান থেকে দৃষ্টিকে নিচের দিকে নামিয়ে আনতে সহায়তা করে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এগুলো ঘরের উঁচু ও নিচু অংশের মধ্যে একটি সুন্দর সংযোগ তৈরি করে। ফলে পুরো আয়োজনটি অগোছালো না হয়ে বরং সুপরিকল্পিত ও নান্দনিক মনে হয়।

পাত্র বা টবের সঠিক ব্যবহার

গাছের পাত্র বা টবের বিষয়টি অনেকেই খুব একটা গুরুত্ব দেন না, অথচ এটি ইনডোর প্ল্যান্ট সাজানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাত্রগুলো ঘরের সামগ্রিক সাজসজ্জায় বড় ভূমিকা রাখে। তাই এগুলোকে কেবল গাছ রাখার সাধারণ আধার হিসেবে না দেখে ঘরের সাজেরই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
একই ধরনের পাত্র ব্যবহার করলে ঘরে একটি শান্ত ও পরিপাটি ভাব আসে। আবার ভিন্ন উপাদান বা ফিনিশের পাত্র ব্যবহার করেও স্বকীয়তা আনা যায়। তবে সেক্ষেত্রে পাত্রগুলোর মধ্যে রঙ বা টেক্সচারের মতো কোনো সাধারণ মিল থাকা ভালো।
গাছগুলো যদি নিজেরাই খুব আকর্ষণীয় বা জমকালো হয়, তাহলে সাধারণ বা সাদামাটা পাত্র ব্যবহার করাই ভালো। এতে গাছের সৌন্দর্য আরও ভালোভাবে ফুটে ওঠে। অন্যদিকে গাছগুলো যদি সাধারণ বা অনাড়ম্বর হয়, তাহলে জমকালো বা নকশাদার পাত্র পুরো সাজসজ্জার মান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ঘরের পরিবেশের সাথে মানানসই গাছ নির্বাচন

স্টাইলিশ বা সুন্দর সাজসজ্জা হলেও তা আপনার ঘরের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হতে হবে। ঘরের আলো, আর্দ্রতা এবং জায়গার পরিমাণ—এসব বিষয় বিবেচনা করেই ঠিক করতে হবে কোন গাছটি সেখানে ভালোভাবে বেড়ে উঠবে। রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (RHS) পরামর্শ দেয়, গাছ যেখানে রাখা হবে সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানানসই গাছই বেছে নেওয়া উচিত। কারণ ধুঁকতে থাকা বা অসুস্থ গাছ ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর বদলে উল্টো পরিবেশকে মলিন করে দিতে পারে।
সূর্যালোকযুক্ত জানালার পাশে রোদ-পছন্দকারী গাছ রাখা যেতে পারে। আবার কম আলোযুক্ত কোণায় এমন গাছ রাখা উচিত, যেগুলো কম আলোতেও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। কম জায়গার ঘরে গাছ সাজানোর ক্ষেত্রে উল্লম্ব তাক (vertical shelves) বা ঝুলন্ত টব ব্যবহার করা বেশ সুবিধাজনক। এতে ঘরের মেঝে বা আসবাবের ওপরের জায়গা বেশি দখল না করেও সবুজের ছোঁয়া আনা যায়।

পটভূমি ও রঙের বিষয়টি বিবেচনা করুন

গাছের পাতার রঙ ও নকশা সেগুলোকে দলবদ্ধভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হালকা রঙের দেয়ালের বিপরীতে সবুজ পাতা বেশ সতেজ ও উজ্জ্বল দেখায়। অন্যদিকে গাঢ় রঙের দেয়ালের সামনে হালকা রঙের বা নকশাদার পাতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠতে পারে। বিচিত্র রঙের পাতা (variegated leaves), চকচকে ভাব এবং সূক্ষ্ম বা চওড়া পাতার গঠন—এসব বিষয়ই সামগ্রিক সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
একাধিক গাছ একসঙ্গে রাখার সময় এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে সেগুলো একে অপরের সঙ্গে দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়। একটি আকর্ষণীয় গাছকে মূল কেন্দ্রবিন্দু বা ‘স্টার’ হিসেবে রাখা যেতে পারে এবং অন্য গাছগুলো তার সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তুলবে—ঠিক যেমন একজন প্রধান গায়কের সঙ্গে দক্ষ ব্যাকআপ ব্যান্ড থাকে।

গাছ এমন জায়গায় রাখুন যাতে তা উপভোগ করা যায়

আরএইচএস (RHS)-এর মতে, ঘরের গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেগুলো কীভাবে সাজানো হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখানে এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ভালোভাবে দেখা যায়। আসবাবপত্রের আড়ালে বা কোনো অস্বস্তিকর সরু জায়গায় গাছ গুঁজে রাখা ঠিক নয়। বেশ কয়েকটি গাছ একসঙ্গে গুচ্ছাকারে রাখলে তা বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, বিশেষ করে যখন গাছগুলোর পরিচর্যার ধরন একই রকম হয়।
আবার, সঠিক জায়গায় রাখা একটিমাত্র গাছও টেবিল, তাক বা চেয়ারের পাশে ঘরের প্রধান আকর্ষণ বা ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে চমৎকার কাজ করতে পারে। অনেক সময় মনোযোগ কাড়ার জন্য গাদাগাদি করে রাখা পাঁচটি গাছের চেয়ে একটি সুন্দর ও সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ঘরের গাছগুলোকে একসঙ্গে সুন্দরভাবে সাজানোর মূল চাবিকাঠি হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। বিভিন্ন আকৃতি ও উচ্চতার গাছের সমন্বয় করুন, ভেবেচিন্তে টব বা পাত্র বেছে নিন এবং প্রতিটি গাছ এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে গাছটি ও আপনার ঘর—দুটিই সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। গাছগুলোকে কেবল এলোমেলো সবুজ উদ্ভিদ হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত শিল্পকর্ম বা ‘কম্পোজিশন’ হিসেবে সাজালে ঘরের পরিবেশ হয়ে উঠতে পারে আরও শান্ত, নান্দনিক ও অতিথিপরায়ণ।
বাড়িতে গাছের অবস্থান কিছুটা অদলবদল করে দেখুন কোনটি সবচেয়ে ভালো মানায়। হয়তো একটি চমৎকার গাছ-সমন্বয়ই আপনার ঘরকে এক নিমিষে আরও সুন্দর, পরিপাটি ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন