উদ্ভিদ

ঘরের গাছ পরিচর্যা

বন্ধুরা, কেমন আছেন? কারও বাড়িতে ঢুকলে এমন কিছু গাছ চোখে পড়ে, যেগুলো দেখে মনে হয় যেন কোনো বোটানিক্যাল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে সরাসরি উঠে এসেছে—ঝকঝকে পাতা, প্রাণবন্ত সবুজ রং, যেন আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে!
অথচ নিজের জানালার ধারে রাখা সেই মলিন ফার্ন গাছটির দিকে তাকালে মনে হয়, যেন সে কোনো দুঃসংবাদ পেয়েছে। তাহলে তাদের এই সতেজ সৌন্দর্যের রহস্য কী? তারা কি মাঝরাতে গাছকে অনুপ্রেরণামূলক কথা শোনায়?

আলোই আসল কথা (না, সত্যিই বলছি)

আপনার ঘরের গাছগুলোকে জানালার কাছে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে উজ্জ্বল কিন্তু পরোক্ষ আলো (indirect light) পাওয়া যায়। সালোকসংশ্লেষণ ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টিকে গাছের জন্য ‘মর্নিং কফি’ বা সকালের উদ্দীপক পানীয় হিসেবে ভাবতে পারেন।
যদি গাছটি অস্বাভাবিক লম্বা ও সরু (leggy) হয়ে যায়, ফ্যাকাশে দেখায় বা ছোট আকারের পাতা গজাতে থাকে, তাহলে সম্ভবত তার আরও আলোর প্রয়োজন। রঙিন পাতার গাছগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলকভাবে বেশি আলোর প্রয়োজন হতে পারে। আর কয়েক দিন পরপর টবটি ঘুরিয়ে দিলে গাছের সবদিকে আলো পৌঁছাতে পারে এবং বৃদ্ধি আরও সুষম হতে পারে।

গাছকে পুষ্টি দিন!

কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন কিছু গাছ সতেজ থাকে আর কিছু গাছ ধুঁকতে থাকে? এর একটি কারণ হতে পারে পুষ্টির ঘাটতি বা সারের সঠিক ব্যবহার না করা। আলো ও পানি অবশ্যই জরুরি, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও নতুন পাতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সারকে গাছের জন্য এক ধরনের মাল্টিভিটামিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
যেহেতু ঘরের গাছগুলো পুষ্টির জন্য আপনার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাই ভালো মানের মাটি বা পটিং মিক্স ব্যবহার করলেও সময়ের সঙ্গে এর পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে এবং গাছের বৃদ্ধি ধীর হয়ে আসতে পারে। বেশিরভাগ ঘরের গাছের ক্ষেত্রে তরল জৈব সার বা সাধারণ ‘অল-পারপাস’ সার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত প্রয়োগ করা উচিত নয়। খুব কম সারের মতো অতিরিক্ত সারও গাছের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

গাছকে পানিতে ডুবিয়ে মারবেন না

ঘরের গাছের যত্নে অতিরিক্ত পানি দেওয়া বা ‘ওভারওয়াটারিং’ একটি সাধারণ ভুল। সুস্থ শিকড় সাধারণত সাদা বা ক্রিম রঙের হয়, কিন্তু পচে গেলে তা গাঢ় বাদামী বা কালো হয়ে যেতে পারে।
মাটি বা পোড়ামাটির (টেরাকোটা) টব অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তাই স্নেক প্ল্যান্ট বা হোয়ার (hoya)-এর মতো গাছের জন্য এগুলো ভালো পছন্দ হতে পারে, কারণ এই গাছগুলো সাধারণত দুইবার পানি দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে মাটি কিছুটা শুকিয়ে যাওয়া পছন্দ করে।

পাতাগুলো পরিষ্কার রাখুন

অনেকেই বিষয়টি উপেক্ষা করেন, কিন্তু ঘরের গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো সূর্যের আলো পাতায় পৌঁছাতে বাধা দিতে পারে এবং গ্যাস আদান-প্রদানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে। পাশাপাশি ধুলোর কারণে পাতাগুলো নিষ্প্রাণ ও মলিনও দেখায়।
মাঝেমধ্যে আলতো করে পাতাগুলো মুছে দিন, ঠিক যেভাবে আপনি আপনার প্রিয় সানগ্লাস পরিষ্কার করেন। এতে পাতাগুলো পরিষ্কার ও সতেজ দেখাবে এবং গাছের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও সহায়তা করতে পারে।

ছাঁটাই করুন, গাছকে সতেজ রাখুন

গাছ ছাঁটাই বা ‘প্রুনিং’ করলে ক্ষতিগ্রস্ত বা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া অংশ সরানো যায় এবং নতুন পাতা ও ডালপালা গজানোর জন্য গাছকে উদ্দীপিত করা যায়। সঠিক জায়গায় ছাঁটাই করলে, গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ একটি লম্বা ও জীর্ণ-দর্শন ইনডোর প্ল্যান্ট (ঘরের ভেতরের গাছ) আবারও ঘন ও সতেজ হয়ে উঠতে পারে।
বিষয়টিকে অনেকটা চুল কাটানোর মতো করে ভাবুন। সঠিকভাবে ছাঁটাই করলে গাছের অপ্রয়োজনীয় অংশ সরানো যায় এবং এর বৃদ্ধির ধরন আরও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। গাছের একেবারে ওপরের দিকের কুঁড়ি (apical bud) কেটে ফেললে পাতার গোড়ায় থাকা সুপ্ত কুঁড়িগুলো (axillary buds) সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে এবং নতুন শাখা গজাতে শুরু করতে পারে। কচি ডগার আগাগুলো হাত দিয়ে ভেঙে বা কেটে দেওয়াও (pinching) গাছে আরও বেশি পার্শ্ব-শাখা ও ফুল গজাতে সহায়তা করতে পারে।

গাছকে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দিন

যদি আপনার গাছের শিকড় টবের ভেতরে ঠাসাঠাসি অবস্থায় থাকে বা গোল হয়ে জড়িয়ে যায় (rootbound), তাহলে সেটিকে তুলনামূলক বড় টবে স্থানান্তর করার সময় হয়েছে। বিষয়টি অনেকটা দুই সাইজ ছোট জুতো পরে ম্যারাথন দৌড়ানোর চেষ্টার মতো। সাধারণত নতুন টব নির্বাচনের সময় আগের টবের চেয়ে ব্যাসের দিক থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি বড় টব বেছে নেওয়া যেতে পারে। এই সামান্য পরিবর্তনই গাছের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
গাছকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার কোনো জাদুকরী উপায় নেই। এর মূল রহস্য হলো সাধারণ পরিচর্যাগুলো সঠিকভাবে করা: পর্যাপ্ত আলো দেওয়া, পরিমিত ও সঠিক পদ্ধতিতে পানি দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ, পাতা পরিষ্কার রাখা, সময়মতো ছাঁটাই করা এবং বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া।
একবারে একটি করে পরিবর্তন শুরু করুন, দেখুন আপনার গাছ তাতে কেমন সাড়া দিচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি উপভোগ করুন। একটু ধৈর্য ও নিয়মিত যত্নই হয়তো আপনার মলিন ইনডোর প্ল্যান্টকে আবারও সতেজ, ঘন ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন