উদ্ভিদ

উচ্চতা অনুযায়ী গাছ সাজানো

প্রিয় পাঠক, একটি পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাগান অনেকটা চমৎকার একটি দলীয় ছবির মতো। সবাই যদি একই সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে পুরো দৃশ্যটি কেমন যেন বেমানান লাগে।
কিন্তু লম্বা মানুষরা যখন পেছনে, মাঝারি উচ্চতাররা মাঝখানে এবং ছোটরা সামনে দাঁড়ায়, তখন সবকিছু যেন ঠিকঠাক মানিয়ে যায়। উচ্চতা অনুযায়ী গাছ সাজানোর বা ‘লেয়ারিং’-এর জাদু ঠিক এমনই।
এটি বাগানে গভীরতা আনে, প্রতিটি গাছকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ করে দেয় এবং পুরো জায়গাটিকে অগোছালো না করে বরং সজীব ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
একটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললে কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। যদি বাগানের কোনো অংশ বা ‘বর্ডার’ কেবল এক পাশ থেকে দেখা যায়, তাহলে সবচেয়ে লম্বা গাছগুলো পেছনের দিকে রাখুন। আর যদি চারপাশ থেকেই বাগানটি দেখা যায়, তাহলে লম্বা গাছগুলো মাঝখানে স্থাপন করুন। এরপর সামনের দিকে বা কিনারার দিকে আসার সঙ্গে সঙ্গে গাছের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনুন। এতে একটি প্রাকৃতিক ঢাল তৈরি হয়, যা প্রতিটি স্তরের সৌন্দর্যকে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলে। এমন বিন্যাস না থাকলে লম্বা গাছের আড়ালে ছোট গাছগুলো হারিয়ে যেতে পারে—ঠিক যেন পর্দার আড়ালে আটকে পড়া কোনো ছোট অভিনেতার মতো।

সবচেয়ে লম্বা স্তর দিয়ে শুরু করুন

সবচেয়ে লম্বা গাছগুলো বাগানের মূল কাঠামো বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বসার ঘরের বড় আসবাবপত্রের মতোই এগুলো বাগানের নকশাকে সুবিন্যস্ত ও সুদৃঢ় করে তোলে। সাধারণত ঝোপালো গাছ (shrubs), লম্বা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, ঘাসজাতীয় গাছ অথবা কোনো অবলম্বনে বেড়ে ওঠা লতানো গাছ এই স্তরের জন্য উপযুক্ত।
এগুলোকে যেনতেনভাবে বা এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লাগানো উচিত নয়। বরং সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করুন, যাতে দৃষ্টির জন্য কিছু নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়। বাগানের একাধিক স্থানে এই লম্বা গাছগুলোর পুনরাবৃত্তি করলে পুরো বাগানটি বিচ্ছিন্ন না হয়ে বরং একটি সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রূপ পায়।
গাছের উচ্চতা মানেই কেবল তার গায়ে লাগানো লেবেল বা ট্যাগে লেখা মাপ নয়। আলো, মাটি, পানি এবং স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে একটি গাছ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লম্বা বা খাটো হতে পারে। তাই আপনার বাগানে গাছগুলো বাস্তবে কেমন বাড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
নকশায় হয়তো কোনো বর্ডার বা সীমানা বেশ ভারসাম্যপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু গাছগুলো যদি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বা ঘন হয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে সেটি ঘন পাতার জঞ্জাল বা ‘ট্রাফিক জ্যাম’-এর মতো বিশৃঙ্খল অবস্থায় পরিণত হতে পারে।

মাঝের অংশটি সাজিয়ে তুলুন

বাগানের পরিপূর্ণতা বা সমৃদ্ধ ভাবটি মূলত মাঝের স্তরের গাছগুলোর মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। এই গাছগুলো পেছনের লম্বা গাছ এবং সামনের ছোট গাছগুলোর মধ্যে একটি সুন্দর সংযোগ তৈরি করে। ফলে উচ্চতার পরিবর্তনটি মসৃণ ও মনোরম মনে হয় এবং পুরো বাগানটিকেই আরও সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ বলে মনে হয়।
মাঝারি উচ্চতার বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, গুচ্ছাকারে বা ঢিবির মতো বেড়ে ওঠা গাছ এবং কম ছড়ানো ঝোপালো গাছ সাধারণত এই স্তরের জন্য ভালো মানায়। এই স্তরে নানা রঙ ও গঠনের (টেক্সচার) গাছ ব্যবহার করা যেতে পারে, কারণ স্বাভাবিক উচ্চতা থেকে চোখ বোলালে বাগানের এই অংশটিই সবচেয়ে সহজে নজরে পড়ে।
একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো গাছগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না লাগিয়ে বরং দলবদ্ধভাবে বা গুচ্ছাকারে সাজানো। একই ধরনের গাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না লাগিয়ে গুচ্ছাকারে বা সারিবদ্ধভাবে লাগালে তা দেখতে অনেক বেশি প্রশান্তিদায়ক ও আকর্ষণীয় মনে হয়। এতে বাগানের নকশায় এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং পুরো আয়োজনটি বিশৃঙ্খল মনে হয় না।
এছাড়া একই রঙের বা আকারের পাতা ও ফুলের পুনরাবৃত্তি বাগানের পুরো অংশে একটি ছন্দময় আবহ তৈরি করে। এর ফলে বাগানটিকে আরও সুপরিকল্পিত ও নান্দনিক মনে হয়।

সামনের অংশটি নিচু ও আকর্ষণীয় রাখুন

একদিকের সীমানা বা বর্ডারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ছোট গাছগুলো সামনে এবং ‘আইল্যান্ড বেড’ বা দ্বীপের মতো আলাদা বাগানের ক্ষেত্রে বাইরের কিনারা বরাবর রাখা উচিত। এক্ষেত্রে মাটি ঢেকে রাখে এমন গাছ (ground cover), কিনারা সাজানোর গাছ (edging plants) এবং কম উচ্চতার ফুলগাছ বেছে নেওয়া ভালো।
সামনের এই স্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বাগানের কিনারাকে কোমল ও স্নিগ্ধ করে তোলে, খালি মাটি ঢেকে রাখে এবং দর্শনার্থীর দৃষ্টিকে বাগানের ভেতরের দিকে টেনে নেয়। এটিকে বাগানের ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ বা উষ্ণ অভ্যর্থনা হিসেবে ভাবতে পারেন। তাই এই অংশটি যেন পরিপাটি ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, কোনো অগোছালো জঞ্জালে পরিণত না হয়।
সামনের দিকে ছোট গাছ থাকলে রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হয়। লম্বা গাছের ডালপালার বাধা ছাড়াই এগুলোর নাগাল পাওয়া যায় এবং এগুলো পেছনের গাছগুলোর দৃশ্য আড়াল করে না। চাইলে এখানে লতানো গাছও লাগানো যেতে পারে, যা কিনারার ওপর দিয়ে বা হাঁটার পথের দিকে কিছুটা ঝুলে পড়ে এক ধরনের স্নিগ্ধ ও কোমল সৌন্দর্য তৈরি করবে।

গাছের মধ্যকার দূরত্ব ও আকারের সঠিক ব্যবহার

গাছের উচ্চতার বিন্যাস সঠিক হওয়া সত্ত্বেও, গাছগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত ফাঁকা জায়গা থাকলে বা সব গাছের আকার একই রকম হলে বাগানটি ফাঁকা বা শ্রীহীন মনে হতে পারে। গাছের উচ্চতার পাশাপাশি সেগুলো কতটা জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তার ওপরই বাগানের পূর্ণতা বা ঘনত্বের বিষয়টি নির্ভর করে।
সোজা বা খাড়া আকৃতির গাছের সঙ্গে গোলাকার ঝোপালো গাছ এবং সূক্ষ্ম গঠনের পাতার সঙ্গে বড় ও চওড়া পাতার গাছের সমন্বয় ঘটান। এই বৈচিত্র্য বাগানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। একই সঙ্গে গাছগুলো বড় হওয়ার পর কতটা জায়গা নেবে, তা বিবেচনা করে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা রাখুন। এতে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে বাগানটি গাদাগাদি করে থাকা কোনো ট্রেনের মতো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে না।
গাছের স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে ফুল ফোটার সময় এবং পাতার বৈশিষ্ট্য—উভয় বিষয়ই বিবেচনায় রাখা জরুরি। যদি কোনো অংশ অল্প সময়ের জন্য চমৎকার দেখায় এবং এরপরই ফাঁকা বা শ্রীহীন হয়ে পড়ে, তাহলে বাগানের সামগ্রিক পূর্ণতা দ্রুত নষ্ট হতে পারে।
বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এমন গাছের সমন্বয় ঘটালে বাগানটি দীর্ঘ সময় ধরে সুন্দর রাখা সম্ভব। পরিশেষে বলা যায়, উচ্চতা অনুযায়ী গাছ সাজানোর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি গাছকে এমনভাবে স্থাপন করা, যাতে তারা একে অপরের সৌন্দর্য আড়াল না করে বরং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে পারে।
সবচেয়ে লম্বা গাছ দিয়ে কাঠামো তৈরি শুরু করুন, এরপর মাঝের স্তরে এমন গাছ লাগান যা সবকিছুর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং সবশেষে সামনের দিকে নিচু গাছ দিয়ে কিনারা সাজান, যা বাগানটিকে পরিপাটি ও আকর্ষণীয় করে তুলবে। উচ্চতা, আকার এবং বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে গাছ সাজাতে সামান্য সময় দিলেই আপনার বাগানটি অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠতে পারে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন