উদ্ভিদ

আলোর টানে উদ্ভিদ

প্রিয় পাঠক, জানালার ধারে রাখা একটি ছোট চারাগাছকে দেখে অনেক সময় প্রায় জাদুকরী কিছু মনে হতে পারে। একদিন এটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কিছুদিন পর দেখা যায়, ঘরের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশের দিকে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে।
এই নিঃশব্দ নড়াচড়া কিন্তু কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়। আলো কোথায় রয়েছে তা অনুভব করে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের বৃদ্ধিকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা উদ্ভিদের রয়েছে, যাতে তাদের পাতাগুলো আরও কার্যকরভাবে আলো সংগ্রহ করতে পারে।
তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হেঁটে যেতে পারে না ঠিকই, কিন্তু চারপাশের পরিবেশের প্রতি প্রতিনিয়ত সাড়া দেয়। এই সাড়া দেওয়ার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো 'ফটোট্রপিজম' (phototropism)—অর্থাৎ আলোর দিক অনুযায়ী উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া।

ফটোট্রপিজম কী

নির্দিষ্ট কোনো দিক থেকে আলো এলে উদ্ভিদ যেভাবে তার বৃদ্ধির দিক পরিবর্তন করে, তাকেই ফটোট্রপিজম বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে উদ্ভিদের কাণ্ড বা অঙ্কুর আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। একে বলা হয় 'পজিটিভ ফটোট্রপিজম' বা ধনাত্মক ফটোট্রপিজম। অন্যদিকে, শিকড় বা মূল প্রায়শই এর বিপরীত আচরণ করে এবং আলোর উৎস থেকে দূরে সরে গিয়ে বৃদ্ধি পায়; একে বলা হয় 'নেগেটিভ ফটোট্রপিজম' বা ঋণাত্মক ফটোট্রপিজম।
বৃদ্ধির এই ধরনগুলো উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশকে তাদের নিজ নিজ কাজ সঠিকভাবে করতে সহায়তা করে। পাতা ও কাণ্ড আলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে উপকৃত হয়, আর শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজে নেয়।

উদ্ভিদ কীভাবে আলো শনাক্ত করে

উদ্ভিদ তার কলার (tissue) মধ্যে থাকা বিশেষ জৈবিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আলো শনাক্ত করে। কাণ্ড বা অঙ্কুরের ক্ষেত্রে, আলোর তীব্রতা কোন দিকে বেশি—তা বোঝার জন্য এর অগ্রভাগ বা ডগা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন আলোর উৎস থেকে কোনো এক পাশে বেশি আলো পড়ে, তখন উদ্ভিদের ভেতরে অভ্যন্তরীণ সংকেত আদান-প্রদানের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এটি মাথা ঘোরানোর মতো কোনো দ্রুত দৃশ্যমান নড়াচড়া নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে সংঘটিত হওয়া এক ধরনের বৃদ্ধি-প্রক্রিয়া, যা উদ্ভিদের ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাইরে থেকে প্রায় অদৃশ্য মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি প্রক্রিয়া।

বৃদ্ধির সংকেতের ভূমিকা

ফটোট্রপিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'অক্সিন' (auxin)—এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা এক ধরনের উদ্ভিদ হরমোন। যখন কোনো এক পাশ থেকে আলো পড়ে, তখন কাণ্ডের মধ্যে অক্সিন অসমভাবে বণ্টিত হয়। আলোর বিপরীত, অর্থাৎ ছায়াযুক্ত অংশে এর ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
সেখানে অক্সিন কোষগুলোকে আলোর দিকের কোষগুলোর তুলনায় বেশি লম্বা হতে বা প্রসারিত হতে উৎসাহিত করে। এক পাশের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কাণ্ডটি ধীরে ধীরে আলোর দিকে বেঁকে যায়। অর্থাৎ এই বাঁক তৈরি হয় অসম বৃদ্ধির কারণে, কোনো আকস্মিক নড়াচড়ার মাধ্যমে নয়।
এটি একটি চমৎকার উদাহরণ যে, কীভাবে একটি সাধারণ পরিবেশগত সংকেত উদ্ভিদের সামগ্রিক বৃদ্ধির গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।

আলোর বাইরেও দিক-নির্ণয়

উদ্ভিদ শুধু আলোর প্রতিই নয়, অন্যান্য পরিবেশগত সংকেতের প্রতিও বিভিন্নভাবে সাড়া দেয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হলো 'জিওট্রপিজম' (geotropism) বা 'গ্র্যাভিট্রপিজম' (gravitropism)—অর্থাৎ অভিকর্ষ বলের সাপেক্ষে উদ্ভিদের বেড়ে ওঠা।
সাধারণত উদ্ভিদের কাণ্ড বা অঙ্কুর ওপরের দিকে এবং শিকড় বা মূল নিচের দিকে বৃদ্ধি পায়। আলো ও অভিকর্ষের প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা—এই দুটি বিষয় একত্রে উদ্ভিদকে তার অবস্থান ঠিক রাখতে সহায়তা করে।
কোনো চারাগাছ যদি হেলে পড়ে বা তাকে কোনো অস্বাভাবিক অবস্থানে রাখা হয়, তবে এই প্রক্রিয়াগুলো যৌথভাবে কাজ করে কাণ্ড ও মূলকে পুনরায় তুলনামূলকভাবে সঠিক ও কার্যকর অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

বেঁচে থাকার জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

আলো ও দিক নির্ণয় করতে পারা উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোর দিকে বেঁকে যাওয়া কাণ্ড তার পাতাগুলোকে এমন স্থানে স্থাপন করতে সাহায্য করে, যেখানে সালোকসংশ্লেষণ কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে পারে। অন্যদিকে, মাটির গভীরে বা নিচের দিকে বেড়ে ওঠা মূল উদ্ভিদকে মাটির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখে এবং প্রয়োজনীয় পানি ও খনিজ উপাদান সংগ্রহে সহায়তা করে।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো না থাকলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি অনেক কম কার্যকর হতে পারত। ঘন গাছপালার ভিড়ে, বনের আচ্ছাদনের নিচে কিংবা ঘরের জানালার পাশে—যেকোনো পরিবেশেই দিক নির্ণয়ের এই ক্ষমতা উদ্ভিদের বেড়ে ওঠায় বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
বাইরে থেকে উদ্ভিদকে স্থির মনে হলেও, তারা আসলে সবসময়ই সূক্ষ্মভাবে তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সংকেত গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের বৃদ্ধিকে সামঞ্জস্য করে। আলো ও অভিকর্ষের প্রতি তাদের সাড়া দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া আসলে কতটা সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত।
পরের বার যখন দেখবেন ঘরের কোনো গাছ জানালার দিকে ঝুঁকে আছে, তখন সেটিকে শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য হিসেবে দেখবেন না। এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে, জীবজগতের প্রতিটি সদস্যই নিজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান খুঁজে নেওয়ার নিজস্ব উপায় তৈরি করেছে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন