প্রাণী

চিনতে পারে শিম্পাঞ্জি?

বন্ধুরা, কল্পনা করুন ২৫ বছর পর শৈশবের কোনো বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলো।
আপনি কি তার মুখ চিনতে পারবেন? তার সঙ্গে কাটানো পুরনো সময়গুলোর কথা কি মনে পড়বে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই পরিচিত মানুষটির সঙ্গে আগের সম্পর্কের অনুভূতিও কি আপনার মনে জেগে উঠবে? আশ্চর্যের বিষয় হলো, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক স্মৃতির এমন ক্ষমতা দেখা গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, কয়েক দশক আলাদা থাকার পরও তারা পরিচিত সঙ্গীদের শনাক্ত করতে পারে। এই ক্ষমতা শুধু মুখ চেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার স্মৃতির সঙ্গেও এর যোগ থাকতে পারে।
শিম্পাঞ্জিদের সমাজ পারিবারিক সম্পর্ক, সহযোগিতা, জোট, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অভিজ্ঞতার ওপর গড়ে ওঠে। তাই কে আত্মীয়, কে সহযোগী এবং কার সঙ্গে অতীতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল—এসব তথ্য মনে রাখা তাদের সামাজিক জীবনে মূল্যবান হতে পারে। বহু বছর পর কোনো পুরনো সঙ্গীকে চিনতে পারার ক্ষমতা তাদের জটিল সামাজিক জগত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও গভীর করে।

কয়েক দশক পরও চেনার ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

এই ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৩ সালে ‘অ্যানিমাল কগনিশন’ (Animal Cognition) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়। গবেষকরা এমন শিম্পাঞ্জি ও বনোবোদের ওপর পরীক্ষা চালান, যারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের পুরনো সামাজিক সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতার সময়কাল ২৫ বছরেরও বেশি ছিল।
আই-ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে ধরা পড়ল পরিচিত মুখের প্রতি আগ্রহ
গবেষকরা পরিচিত ও অপরিচিত প্রাণীদের ছবি দেখানোর সময় তাদের চোখের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তারা কোন মুখের দিকে কতক্ষণ তাকাচ্ছে এবং পরিচিত প্রাণীদের প্রতি তাদের মনোযোগে কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে কি না।
ফলাফলে দেখা যায়, শিম্পাঞ্জি ও বনোবোরা পরিচিত সামাজিক সঙ্গীদের ছবির দিকে অপরিচিত প্রাণীদের তুলনায় বেশি সময় ধরে তাকাতে পারে। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে তাদের অতীতে ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক ছিল, তাদের প্রতি এই মনোযোগ আরও স্পষ্ট ছিল।
এটি ইঙ্গিত করে যে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ না থাকার পরও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতি তাদের স্মৃতিতে টিকে থাকতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু একই ধরনের মুখ দেখার প্রতিক্রিয়া নয়; ব্যক্তিগত সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

শিম্পাঞ্জির সামাজিক স্মৃতি কীভাবে কাজ করে?

শিম্পাঞ্জিদের জীবন মূলত সামাজিক সম্পর্কের জটিল নেটওয়ার্কের মধ্যে পরিচালিত হয়। বন্য পরিবেশে একটি শিম্পাঞ্জির জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্য সদস্যদের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। কেউ হয়তো সহযোগী, কেউ আত্মীয়, আবার কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।
কোনো শিম্পাঞ্জি অতীতে অন্য একজনকে সংঘাতের সময় সাহায্য করেছে, খাবার ভাগ করেছে অথবা কোনো সামাজিক পরিস্থিতিতে তার পাশে দাঁড়িয়েছে—এ ধরনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
সম্পর্কের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ
শিম্পাঞ্জির সামাজিক স্মৃতি শুধু “এই মুখটি পরিচিত” পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অতীতে কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, সেই সম্পর্কটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হবে—এসব সিদ্ধান্তের পেছনেও পুরনো অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখতে পারে।
এই ধরনের সামাজিক স্মৃতি তাদের জোট বজায় রাখতে, আত্মীয়দের শনাক্ত করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে আচরণ নির্ধারণ করতে সহায়তা করতে পারে

মুখ চেনা শুধু চোখের দেখার বিষয় নয়

মানুষ সাধারণত কাউকে চেনাকে খুব সহজ একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবতে পারে। আমরা একটি মুখ দেখি এবং বুঝতে পারি মানুষটি কে। কিন্তু শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রেও পরিচিত মুখ শনাক্ত করার সঙ্গে অতীতের সামাজিক তথ্য যুক্ত হতে পারে।
কোনো পরিচিত শিম্পাঞ্জিকে দেখলে তার সঙ্গে আগের সম্পর্কের তথ্য স্মৃতিতে সক্রিয় হতে পারে। সে কি আত্মীয়? পুরনো সহযোগী? প্রতিদ্বন্দ্বী? একই দলের সদস্য? নাকি দীর্ঘদিন আগে আলাদা হয়ে যাওয়া কোনো পরিচিত প্রাণী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাদের সামাজিক আচরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই পরিচিত মুখ শনাক্ত করার ক্ষমতা শুধু দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য মনে রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অভিজ্ঞতারও সম্পর্ক থাকতে পারে।

বহু বছর পরও সম্পর্কের স্মৃতি টিকে থাকতে পারে

শিম্পাঞ্জিদের সামাজিক জীবন দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তারা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একই পরিবারের সদস্য বা সামাজিক সহযোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারে। কোনো সদস্য পরে অন্য দলে চলে গেলেও আগের পরিচিতি পুরোপুরি হারিয়ে যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষমতা দেখায় যে তাদের সামাজিক স্মৃতি অনেক বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা মানুষের মতো করে প্রতিটি অতীত ঘটনা বা মুহূর্ত হুবহু মনে রাখে। বরং গবেষণার ফলাফল নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতি ও সামাজিক সম্পর্কের স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে।

মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে কী জানা যায়?

শিম্পাঞ্জি মানুষের অন্যতম নিকটতম জীবিত আত্মীয়। মানুষ ও শিম্পাঞ্জির বিবর্তনীয় ইতিহাসে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল। তাই তাদের জটিল সামাজিক স্মৃতি কীভাবে কাজ করে, তা মানুষের সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামাজিক সম্পর্ক যত জটিল, স্মৃতির প্রয়োজনও তত বেশি
যেসব প্রাণী জটিল সামাজিক দলে বসবাস করে, তাদের জন্য অন্য সদস্যদের পরিচয় ও সম্পর্ক মনে রাখা উপকারী হতে পারে। সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, আত্মীয়তা এবং সামাজিক জোটের মতো সম্পর্কগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা মনে রাখার ক্ষমতা সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রেও পুরনো বন্ধু, পরিবারের সদস্য এবং পরিচিত ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন মনে রাখার ক্ষমতা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে অনুরূপ দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক স্মৃতির প্রমাণ পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে এই ধরনের ক্ষমতার বিবর্তনীয় শিকড় অনেক পুরনো হতে পারে।

স্মৃতি যে শুধু মানুষের বিশেষ ক্ষমতা নয়

দীর্ঘদিন ধরে জটিল স্মৃতি ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যেও জটিল মানসিক সক্ষমতা রয়েছে।
শিম্পাঞ্জিরা কয়েক দশক পরও পরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে—এই তথ্য তাদের সামাজিক জীবনকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। তাদের জন্য একটি পরিচিত মুখ হয়তো শুধু একটি মুখ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে বহু বছরের সামাজিক অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিচিতির ইতিহাস।

এই আবিষ্কার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

শিম্পাঞ্জিদের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রাণীদের মস্তিষ্ক ও আচরণ সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু জানার বাকি। কয়েক দশকের ব্যবধানেও পরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষমতা দেখায় যে তাদের সামাজিক স্মৃতি আমরা আগে যতটা সহজভাবে ভাবতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।
তাই বন্ধুরা, পরের বার কোনো শিম্পাঞ্জির মুখের দিকে তাকালে শুধু তার পরিচিত চেহারাটিই দেখবেন না। ভাবুন, সেই মুখের সঙ্গে তার জীবনের কত সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক ইতিহাস যুক্ত থাকতে পারে। হয়তো একটি পরিচিত মুখ তাদের কাছে এমন একটি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়, যা বহু বছর ধরে মনের ভেতরে রয়ে গেছে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন