প্রাণী

সিল কি সত্যিই কাঁদে?

পাঠকবৃন্দ, আপনাদের সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগল! সমুদ্রসৈকত, পাথুরে তট বা বরফের ওপর বিশ্রামরত কোনো সিলকে দেখলে হয়তো একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়তে পারে—তার চোখ যেন পানিতে ভরে আছে, এমনকি সেই পানি গড়িয়ে মুখের ওপর দিয়ে নিচে নেমে আসছে।
দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, প্রাণীটি বুঝি নীরবে কাঁদছে। কিন্তু সিল কি সত্যিই দুঃখে চোখের জল ফেলে?
আসলে বিষয়টি আবেগের চেয়ে অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক। সিলের চোখ থেকে যে তরল বের হতে দেখা যায়, তা সাধারণত চোখকে সুস্থ, আর্দ্র ও সুরক্ষিত রাখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিশেষ করে জল থেকে ডাঙায় ওঠার পর বাতাস, সূর্যালোক, বালি ও ধুলোর মতো পরিবেশগত উপাদান চোখের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তখন অশ্রু-আবরণ চোখের পৃষ্ঠকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সিল সত্যিই চোখের জল তৈরি করে

অন্যান্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো সিলেরও অশ্রুগ্রন্থি রয়েছে, যা চোখের উপরিভাগে একটি পাতলা তরল স্তর তৈরি করে। এই অশ্রু-আবরণ বা tear film কর্নিয়াকে আর্দ্র রাখে এবং চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এই তরলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এটি কর্নিয়াকে শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, চোখের পৃষ্ঠে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি সরবরাহ করে, ক্ষুদ্র কণা ধুয়ে ফেলতে সাহায্য করে এবং চোখের বাইরের অংশকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখে।
সিলের শরীরের বড় অংশ জলজ পরিবেশে অভিযোজিত হলেও চোখের আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য তারা সরাসরি সমুদ্রের পানির ওপর নির্ভর করতে পারে না। সমুদ্রের পানিতে লবণ ও অন্যান্য দ্রবীভূত পদার্থের ঘনত্ব থাকে, আর চোখের অশ্রু-আবরণের রাসায়নিক গঠন শরীর নিজস্বভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই চোখ সুস্থ রাখতে সিলের নিজস্ব অশ্রু উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন ডাঙায় সিলের চোখের জল বেশি দেখা যায়

সিল যখন সমুদ্রের বাইরে সৈকত, পাথর বা বরফের ওপর বিশ্রাম নেয়, তখন তার চোখের আর্দ্রতা আমাদের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। পানির নিচে চোখের চারপাশের পরিবেশ একরকম থাকে, কিন্তু ডাঙায় ওঠার পর চোখ সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শে আসে।
বাতাস চোখের অশ্রু-আবরণ থেকে বাষ্পীভবন বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শুষ্ক পরিবেশ, সূর্যালোক, ধুলা কিংবা বালুকণাও চোখের ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে অশ্রু-আবরণ চোখের পৃষ্ঠকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে।
কখনো চোখের কোণে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল গড়িয়ে মুখের ওপর দিয়ে নেমে আসতে পারে। সিলের মুখের মসৃণ গঠনের কারণে সেই তরল স্পষ্ট রেখার মতোও দেখা যায়। ফলে দূর থেকে মনে হতে পারে প্রাণীটি কাঁদছে। কিন্তু এমন দৃশ্য দেখলেই যে সিলটি দুঃখী, আহত বা কষ্টে আছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

তৃতীয় চোখের পাতা সিলের চোখকে দেয় বাড়তি সুরক্ষা

সিলের চোখের একটি চমৎকার অভিযোজন হলো 'নিকটিটেটিং মেমব্রেন' বা তৃতীয় চোখের পাতা। এটি একটি পাতলা, আধা-স্বচ্ছ পর্দা, যা চোখের ওপর দিয়ে সরে এসে দৃষ্টিশক্তিকে পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত না করেই চোখকে বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে।
জলে চলাচলের সময় এই পর্দা চোখের কর্নিয়াকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র কণা বা বাহ্যিক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে চোখের উপরিভাগ আর্দ্র রাখতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
জল ও ডাঙা—দুই ধরনের পরিবেশে চলাফেরা করা প্রাণী হিসেবে সিলের চোখকে নিয়মিত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। পানির নিচে ভাসমান কণা, পানির উপরিভাগে সূর্যের প্রতিফলন, বাতাস এবং ডাঙার ধুলাবালি—সবকিছুই চোখের জন্য আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তৃতীয় চোখের পাতাসহ অশ্রু-ব্যবস্থা এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

লোনা পানি আর সিলের চোখের পানি এক নয়

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, সিলের চোখ দিয়ে যে পানি গড়িয়ে পড়ে সেটি আসলে চোখে লেগে থাকা সমুদ্রের পানিই। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। অশ্রু বিশেষ গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয় এবং এতে পানি, ইলেক্ট্রোলাইট, প্রোটিন, লিপিডসহ বিভিন্ন উপাদান থাকে।
অন্যদিকে সমুদ্রের পানির রাসায়নিক গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখের স্বচ্ছ কর্নিয়াকে সুস্থ রাখতে একটি নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল অশ্রু-আবরণ প্রয়োজন। এই আবরণ চোখের পৃষ্ঠকে আর্দ্র রাখার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সিল যখন পানিতে থাকে কিংবা ডাঙায় উঠে আসে, তখন পরিবেশ বদলে গেলেও তার চোখকে এই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়। তাই চোখের পানি সিলের শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থারই একটি অংশ।

চোখে পানি মানেই কি সিলটি দুঃখ পেয়েছে?

সব সময় তা নয়। মানুষের ক্ষেত্রে চোখের পানি প্রায়ই দুঃখ, ব্যথা, আনন্দ বা অন্য কোনো আবেগের সঙ্গে যুক্ত। তাই কোনো প্রাণীর চোখে পানি দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেটিকে আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারি। কিন্তু সিলের চোখে পানি দেখা গেলেই সেটিকে আবেগীয় কান্না হিসেবে ব্যাখ্যা করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একটি সুস্থ ও শান্ত সিলের চোখ থেকেও স্বাভাবিকভাবে অশ্রু বা তরল বের হতে পারে। তাই শুধু চোখের চারপাশে আর্দ্রতা দেখে প্রাণীটি ভয় পেয়েছে, একাকী হয়েছে কিংবা কষ্ট পাচ্ছে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে সিলের কোনো আবেগ বা জটিল আচরণ নেই। সিলসহ পিনিপেড গোষ্ঠীর প্রাণীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ, শেখা, মাতৃত্বসুলভ আচরণ এবং পরিবেশের প্রতি বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে চোখে পানি থাকা একাই কোনো নির্দিষ্ট আবেগের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়।

কখন চোখের নিঃসরণ সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে

স্বাভাবিক অশ্রু নিঃসরণ এবং অস্বাভাবিক চোখের নিঃসরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যদি কোনো সিলের চোখ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিকভাবে ঘন নিঃসরণ বের হতে থাকে, চোখ ফুলে যায়, তীব্র লালচে ভাব দেখা দেয়, চোখে আঘাতের চিহ্ন থাকে অথবা চোখের পাতা খুলতে সমস্যা হয়, তাহলে সেটি জ্বালা, আঘাত বা কোনো অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিজের হাতে প্রাণীটিকে ধরার বা চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।
এছাড়া সৈকত বা অন্য কোনো স্থানে বিশ্রামরত সিলকে খুব কাছে গিয়ে বিরক্ত করাও ঠিক নয়। অনেক সময় প্রাণীটি স্বাভাবিকভাবেই বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ডাঙায় উঠে আসে। অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি তার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রাণীটি সত্যিই অসুস্থ বা আহত বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষকে জানানোই ভালো।

তাহলে ডাঙায় থাকার সময় সিল কেন কাঁদে?

শেষ পর্যন্ত রহস্যটা বেশ সহজ। আমরা যাকে সিলের কান্না বলে মনে করি, সেটি সাধারণত তার চোখের স্বাভাবিক অশ্রু বা সুরক্ষামূলক তরল। চোখের উপরিভাগকে সবসময় আর্দ্র ও সুরক্ষিত রাখতে এই তরল প্রয়োজন হয়।
জলের ভেতরে থাকার সময় চোখের এই আর্দ্রতা তেমন চোখে না পড়লেও ডাঙায় ওঠার পর বাতাস ও পরিবেশের সংস্পর্শে তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। ফলে চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়া তরলকে মানুষের চোখে কান্নার মতো মনে হয়।
অর্থাৎ সৈকতে বসে থাকা কোনো সিলের ভেজা চোখ দেখলেই ধরে নেওয়ার দরকার নেই যে সে দুঃখে কাঁদছে। বরং সেই চোখের পানি তার শরীরের অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতারই একটি ছোট্ট উদাহরণ—যা জল থেকে ডাঙা, দুই ভিন্ন পরিবেশেই চোখকে সচল ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন