প্রাণী

পেঙ্গুইনের ভিড়ে সঙ্গী

প্রিয় পাঠক, কল্পনা করুন আপনি হাজার হাজার পেঙ্গুইনের একটি বিশাল কলোনির মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে অসংখ্য পাখির ডাক, চলাফেরা আর ব্যস্ততা—এমন ভিড়ে একটি নির্দিষ্ট সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়া মানুষের কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু পেঙ্গুইনদের জন্য বিষয়টি এতটা কঠিন নয়।
তারা সঙ্গীকে শনাক্ত করতে ডাক, বিশেষ আচরণ, বাসার অবস্থান এবং নিজেদের পরিচিত প্রজনন এলাকার মতো একাধিক সংকেত ব্যবহার করতে পারে। তবে সব পেঙ্গুইন একই কৌশলে সঙ্গীকে খুঁজে নেয় না।
বাসা বানানো জেন্টু পেঙ্গুইনের পরিস্থিতি আর বিশাল বরফাচ্ছাদিত কলোনিতে বাসা ছাড়াই সঙ্গী খোঁজা এম্পেরর পেঙ্গুইনের পরিস্থিতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

প্রজনন কলোনিতে ফিরে আসা থেকেই শুরু হয় খোঁজ

অনেক পেঙ্গুইন প্রজাতির ক্ষেত্রে সঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়া আসলে প্রণয়-নিবেদনের আচরণ শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায়। প্রজনন মৌসুমে তারা পরিচিত প্রজনন কলোনিতে ফিরে আসে এবং অনেক সময় আগের বছরগুলোর পরিচিত এলাকাতেই অবস্থান নেয়।
যেসব পেঙ্গুইন বাসা তৈরি করে, তাদের জন্য এটি একটি বড় সুবিধা। কারণ পরিচিত বাসা বা বাসা তৈরির এলাকা সঙ্গীর সঙ্গে পুনরায় দেখা হওয়ার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু প্রজাতির মধ্যে নির্দিষ্ট প্রজনন স্থান এবং সঙ্গীর প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য দেখা যায়। তবে এই প্রবণতা সব প্রজাতি বা সব কলোনিতে সমান নয়।
জেন্টু পেঙ্গুইন এর একটি ভালো উদাহরণ। কোনো কোনো কলোনিতে আগের প্রজননস্থানে ফিরে আসার এবং পুরনো সঙ্গীর সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে একটি পেঙ্গুইনকে পুরো কলোনি নতুন করে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হয় না। পরিচিত স্থান এবং পূর্বের সামাজিক সম্পর্ক তাকে সঙ্গীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি পেঙ্গুইনের সারা জীবনের জন্য একই সঙ্গী নির্ধারিত থাকে। তাদের জোড়া গঠনের ধরন প্রজাতি, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রণয়-নিবেদনের আচরণে তৈরি হয় জোড়া

প্রজনন এলাকায় ফিরে আসার পর পেঙ্গুইনদের বিভিন্ন ধরনের প্রণয়-নিবেদনের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ শারীরিক ভঙ্গি, মাথা ও শরীরের নড়াচড়া, ডাক এবং একে অপরের কাছাকাছি আসার মতো আচরণ জোড়া গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
যেসব প্রজাতি বাসা তৈরি করে, তাদের ক্ষেত্রে বাসার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট প্রজনন এলাকা ধরে রাখার ফলে সঙ্গীরা বারবার একই জায়গায় একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ পায়।
জেন্টু, অ্যাডেলী এবং চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন পাথর ব্যবহার করে বাসা তৈরি করে। সেই বাসা শুধু ডিম রাখার জায়গা নয়; প্রজনন কার্যক্রম এবং জোড়ার পারস্পরিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তাই কোনো পেঙ্গুইন সাধারণত ভিড়ের মধ্যে যেকোনো অপরিচিত পাখিকে বেছে নিয়ে হঠাৎ জোড়া তৈরি করে না। পরিচিতি, আচরণ, অবস্থান এবং পারস্পরিক যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়েই জোড়া গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।

স্বতন্ত্র ডাকই হয়ে উঠতে পারে পরিচয়ের চাবিকাঠি

পেঙ্গুইনদের সঙ্গী শনাক্ত করার সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপায়গুলোর একটি হলো তাদের ডাক। একটি বড় কলোনিতে একই সময়ে শত শত বা হাজার হাজার পেঙ্গুইন ডাকতে পারে। মানুষের কানে সেই শব্দগুলো এক বিশাল কোলাহল মনে হলেও পেঙ্গুইনরা সেই শব্দের মধ্যেও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ডাক আলাদা করতে সক্ষম হতে পারে।
বিভিন্ন পেঙ্গুইন প্রজাতির ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ডাকের মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচয়ের তথ্য থাকতে পারে। বিশেষ করে সঙ্গী এবং বাবা-মা ও ছানার মধ্যে একে অপরকে কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে শনাক্ত করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আফ্রিকান পেঙ্গুইন এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাদের ডাকের বৈশিষ্ট্য থেকে পৃথক পাখিকে শনাক্ত করার মতো তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফলে বিশাল কলোনির মধ্যে শুধুমাত্র চেহারার ওপর নির্ভর না করেও একটি পেঙ্গুইন তার পরিচিত সঙ্গীকে খুঁজে বের করার সুযোগ পায়।
মানুষের চোখে একটি পেঙ্গুইন কলোনি হয়তো অসংখ্য প্রায় একই রকম কালো-সাদা পাখির ভিড়। কিন্তু পেঙ্গুইনদের কাছে সেই ভিড়ের প্রতিটি শব্দের মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত লুকিয়ে থাকতে পারে।

এম্পেরর পেঙ্গুইনদের ক্ষেত্রে সঙ্গী খোঁজা আরও কঠিন

এম্পেরর পেঙ্গুইনদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং, কারণ তারা প্রচলিত অর্থে কোনো স্থায়ী বাসা তৈরি করে না। প্রজনন মৌসুমে একটি পেঙ্গুইনকে বিশাল ও ঘনবসতিপূর্ণ কলোনির মধ্যে তার সঙ্গীকে খুঁজে নিতে হতে পারে।
এখানে নির্দিষ্ট বাসা না থাকায় পরিচিত কোনো বাসার অবস্থানকে সহজ সংকেত হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ কম। ডিমটি বাবা বা মায়ের পায়ের ওপর রাখা হয় এবং পেটের নিচের বিশেষ চামড়ার ভাঁজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ফলে সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত পরিচিতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

ডাকের সংকেতেই ভিড়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় সঙ্গী

এম্পেরর পেঙ্গুইনের কলোনিতে হাজার হাজার পাখির কোলাহলের মধ্যেও স্বতন্ত্র ডাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের ডাকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এমনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, যা একটি নির্দিষ্ট পাখির পরিচয় শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
শব্দের ভিড়ে পরিচিত কণ্ঠ
একবার দৃশ্যটি কল্পনা করুন—অ্যান্টার্কটিকার বরফের ওপর প্রবল বাতাস বইছে, চারপাশে অসংখ্য এম্পেরর পেঙ্গুইন দাঁড়িয়ে আছে এবং একই সময়ে অনেক পাখি ডাকছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু চোখ দিয়ে সঙ্গীকে খুঁজে বের করা কঠিন হতে পারে।
এই সময় পরিচিত ডাক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে ওঠে। একটি পেঙ্গুইন তার সঙ্গীর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তাই এম্পেরর পেঙ্গুইনের জন্য সঙ্গী খোঁজা শুধু দৃশ্যমান অনুসন্ধান নয়; এটি বিশাল সামাজিক ভিড়ের মধ্যে শব্দনির্ভর যোগাযোগেরও একটি অসাধারণ উদাহরণ।

পেঙ্গুইনরা কি সবসময় একই সঙ্গীর কাছে ফিরে আসে?

এখানে একটি প্রচলিত ধারণা একটু সংশোধন করা প্রয়োজন। অনেক সময় বলা হয়, পেঙ্গুইনরা সারাজীবন একই সঙ্গীর সঙ্গে থাকে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সঙ্গীর প্রতি আনুগত্যের মাত্রা আলাদা এবং একই সঙ্গীর সঙ্গে পুনরায় জোড়া বাঁধার হারও প্রজাতি ও কলোনিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট এলাকা-নির্ভর বা টেরিটোরিয়াল পেঙ্গুইনের মধ্যে একই সঙ্গীর সঙ্গে পুনরায় প্রজননের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে এম্পেরর ও কিং পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রে একই সঙ্গীর সঙ্গে পরবর্তী মৌসুমে পুনর্মিলনের হার সাধারণত তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
পুরনো দুই সঙ্গী আবার একত্রিত হবে কি না, তার ওপর অনেক বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো পাখি হয়তো সময়মতো কলোনিতে ফিরতে পারে না, দুই সঙ্গী ভিন্ন সময়ে পৌঁছাতে পারে, আগের সঙ্গী আর ফিরে নাও আসতে পারে, অথবা নতুন কোনো সঙ্গীর সঙ্গে জোড়া তৈরি হতে পারে।
অভিজ্ঞতাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, কম বয়সী অ্যাডেলী পেঙ্গুইনের মধ্যে সঙ্গী ও প্রজননস্থানের প্রতি আনুগত্য তুলনামূলকভাবে কম দৃঢ় হতে পারে এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট সঙ্গী ও স্থানের প্রতি তাদের আচরণ আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
তাই পেঙ্গুইনদের সম্পর্কে “তারা সবসময় একই সঙ্গীর সঙ্গে থাকে”—এমন সাধারণীকরণ না করাই ভালো। বরং বলা যায়, অনেক পেঙ্গুইন নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে শক্তিশালী জোড়া গঠন করে এবং কিছু পেঙ্গুইন বারবার একই সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়।

পরিচিতি, আচরণ আর ডাক—এই তিনেই লুকিয়ে সঙ্গী খোঁজার রহস্য

তাহলে হাজার হাজার পেঙ্গুইনের কোলাহলপূর্ণ কলোনির মধ্যে তারা কীভাবে নিজেদের সঙ্গীকে খুঁজে পায়? এর পেছনে কাজ করে একাধিক সংকেত—পরিচিত প্রজনন এলাকা, বাসার অবস্থান, বিশেষ আচরণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে স্বতন্ত্র ডাক।
কিছু পেঙ্গুইন পরিচিত বাসা বা প্রজনন এলাকায় ফিরে এসে সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পায়। আবার এম্পেরর পেঙ্গুইনের মতো প্রজাতির ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বাসা না থাকায় স্বতন্ত্র ডাক ও শব্দের মাধ্যমে সঙ্গী শনাক্ত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
লাইকার্স (Lykkers), পেঙ্গুইনের বিশাল কলোনি বাইরে থেকে যতই বিশৃঙ্খল মনে হোক না কেন, তার ভেতরে রয়েছে পরিচয় শনাক্ত করার এক চমৎকার সামাজিক ব্যবস্থা। হাজার হাজার পাখির ভিড়েও পরিচিত একটি ডাক, একটি আচরণ বা একটি পরিচিত স্থান তাদের কাছে হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন