প্রাণী
ভোঁদড়ের ৮টি কাণ্ডকারখানা
হ্যালো, লাইকার্স (Lykkers)! বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ভোঁদড় (otter) এমন এক প্রাণী, যাকে দেখলে একই সঙ্গে মুগ্ধ ও আনন্দিত হওয়া যায়। মসৃণ শরীর, চঞ্চল স্বভাব আর অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখের ভঙ্গি তাদের করে তুলেছে প্রকৃতির অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাণী।
কখনও চিত হয়ে পানিতে ভেসে থাকা, কখনও পাথর ব্যবহার করে শক্ত খোলসের খাবার ভাঙা, আবার কখনও সঙ্গীর হাত ধরে থাকা—ভোঁদড়ের এসব আচরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। চলুন জেনে নেওয়া যাক তাদের সম্পর্কে এমন আটটি তথ্য, যা এই প্রাণীগুলোর প্রতি আপনার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবে।
ভোঁদড়রা পানিতে ভেসে থাকার ওস্তাদ
ভোঁদড় জলজ জীবনের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তাদের শরীর ঘন ও জলরোধী লোমে আবৃত, যা লোমের মধ্যে বাতাস আটকে রেখে শরীরকে পানিতে ভাসতে সাহায্য করে। ফলে তারা অনায়াসে চিত হয়ে পানিতে ভেসে থাকতে পারে এবং এই অবস্থাতেই খাওয়া, বিশ্রাম এমনকি ঘুমও সেরে নিতে পারে।
সমুদ্রের ভোঁদড়রা (sea otters) পানিতে ভেসে থাকার সময় স্রোতের সঙ্গে দূরে চলে যাওয়া ঠেকাতে অনেক সময় সামুদ্রিক শৈবাল বা কেলপের মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে রাখে। এতে তারা পানিতে বেশ স্থির থাকতে পারে।

খাবার খেতে পাথরও ব্যবহার করে তারা
প্রাণীজগতে সরঞ্জাম বা হাতিয়ার ব্যবহার করা প্রাণীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। সমুদ্রের ভোঁদড় তাদের মধ্যে অন্যতম। তারা অনেক সময় বুকের ওপর একটি পাথর রেখে সেটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ক্ল্যাম, ঝিনুক (mussels) এবং অন্যান্য শক্ত খোলসযুক্ত সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস ভেঙে খাবার বের করে।
এই আচরণ তাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও বুদ্ধিদীপ্ত আচরণের একটি চমৎকার উদাহরণ। নদীর ভোঁদড় সাধারণত এভাবে পাথর ব্যবহার করে না, তবে তারাও পানিতে দক্ষ শিকারি হিসেবে পরিচিত।
ঘুমানোর সময় সঙ্গীর হাত ধরে রাখে
ভোঁদড়ের সবচেয়ে মিষ্টি আচরণগুলোর একটি হলো বিশ্রাম বা ঘুমের সময় একে অপরের হাত ধরে থাকা। বিশেষ করে সমুদ্রের ভোঁদড়দের মধ্যে এই আচরণ দেখা যায়।
র্যাফটিং (Rafting)
একসঙ্গে হাত ধরে ভেসে থাকার এই আচরণকে র্যাফটিং বলা হয়। পানির স্রোতে যেন তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে এই আচরণ সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি তাদের সামাজিক বন্ধনেরও সুন্দর প্রকাশ।
সামনের পায়ের নিচেই থাকে খাবার রাখার পকেট
সমুদ্রের ভোঁদড়দের সামনের পায়ের নিচের দিকে চামড়ার একটি ঢিলেঢালা অংশ রয়েছে, যা অনেকটা পকেটের মতো কাজ করে। খাবার সংগ্রহ করার সময় তারা এই অংশে খাবার এবং কখনও নিজেদের পছন্দের পাথরও জমা রাখতে পারে।
এই বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য তাদের একসঙ্গে একাধিক জিনিস বহন করতে সাহায্য করে। পানির নিচে খাবার সংগ্রহ করে পরে সেটি সঙ্গে নিয়ে ভেসে থাকার সময় খাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি বেশ কার্যকর।
ভোঁদড় অসাধারণ সাঁতারু
ভোঁদড়ের শরীর এমনভাবে গঠিত যে পানিতে চলাফেরা করা তাদের জন্য বেশ সহজ। তাদের জালিকাযুক্ত পা এবং শক্তিশালী লেজ পানির মধ্যে দ্রুত ও দক্ষভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
তারা কয়েক মিনিট পর্যন্ত শ্বাস ধরে রাখতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানির নিচে ডুব দিয়ে শিকারও করতে পারে। নদীর ভোঁদড় ঘণ্টায় প্রায় ১১ কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটতে সক্ষম হতে পারে। সমুদ্রের ভোঁদড় তুলনামূলক ধীরগতির হলেও পানিতে অত্যন্ত চটপটে এবং দক্ষভাবে চলাফেরা করতে পারে।
খেলাধুলা করতে ভীষণ ভালোবাসে
ভোঁদড়দের চঞ্চল ও কৌতুকপূর্ণ স্বভাব তাদের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। তারা কাদা বা বরফের ঢাল বেয়ে পিছলে নিচে নামতে, একে অপরকে তাড়া করতে কিংবা ছোট নুড়িপাথর ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে খেলতে পছন্দ করে।

খেলাধুলার মধ্যেও শেখার সুযোগ
এই খেলাধুলা শুধু আনন্দের জন্য নয়। এর মাধ্যমে ভোঁদড়দের শিকার, চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগের মতো বিভিন্ন দক্ষতা অনুশীলন ও বিকশিত হতে পারে। আর দর্শকদের কাছে তাদের এই চঞ্চল আচরণই ভোঁদড়কে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
ভোঁদড় অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী
ভোঁদড়ের অনেক প্রজাতিই সামাজিক আচরণ প্রদর্শন করে এবং কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বা দলগতভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। তারা একে অপরের শরীর পরিষ্কার করে দেয়, একসঙ্গে খেলাধুলা করে এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে।
শব্দের মাধ্যমেও চলে যোগাযোগ
নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ, সতর্কতা জানানো কিংবা দলীয় সমন্বয়ের জন্য ভোঁদড় বিভিন্ন ধরনের ডাক ব্যবহার করতে পারে। কিচিরমিচির, শিস কিংবা গর্জনের মতো শব্দ তাদের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গোঁফ দিয়েই পানির নিচে শিকার খুঁজে নেয়
ভোঁদড়ের গোঁফ শুধু মুখের সৌন্দর্য বাড়ায় না, শিকার শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল গোঁফকে বৈজ্ঞানিকভাবে ভাইব্রিসা (vibrissae) বলা হয়।
ঘোলা পানিতেও শিকার শনাক্ত করার ক্ষমতা
এই গোঁফ পানির ক্ষুদ্র কম্পন ও চাপের পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। ফলে পানির নিচে দৃশ্যমানতা কম থাকলেও ভোঁদড় আশপাশে কোনো প্রাণীর নড়াচড়া সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। এই অসাধারণ সংবেদনশীলতা তাদের দক্ষ শিকারিতে পরিণত করতে সাহায্য করে।
শেষ কথা
ভোঁদড় সত্যিই প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। পানিতে ভেসে থাকার ক্ষমতা, পাথরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, সংবেদনশীল গোঁফ, দক্ষ সাঁতার এবং সামাজিক আচরণ—সব মিলিয়ে তাদের জীবনযাপন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
চিত হয়ে পানিতে ভেসে থাকা, শক্ত খোলস ভেঙে খাবার খাওয়া কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে হাত ধরে ভেসে থাকার মতো আচরণ ভোঁদড়কে শুধু আকর্ষণীয়ই করে না, প্রকৃতির অভিযোজন ও প্রাণীদের সামাজিক জীবনের এক চমৎকার উদাহরণও তুলে ধরে। তাই পরের বার কোনো ভোঁদড়কে দেখলে তার মজার কাণ্ডকারখানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ দক্ষতাগুলোর কথাও মনে রাখবেন।