উদ্ভিদ
গাছেরা কথা বলে?
প্রিয় পাঠক, কোনো বাগানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে চারপাশটা হয়তো একেবারে নীরব মনে হতে পারে। কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে গাছপালা মোটেও নিষ্ক্রিয় নয়।
মানুষ যেভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে, গাছেরা অবশ্য সেভাবে যোগাযোগ করে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, তারা বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক সংকেত, শিকড়ের মাধ্যমে নিঃসৃত বিভিন্ন উপাদান এবং মাটির নিচে থাকা ছত্রাকের সংযোগের মাধ্যমে একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে।
এটি কোনো শব্দভিত্তিক কথোপকথন নয়, বরং রাসায়নিক সংকেত, শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া এবং পরিবেশগত সম্পর্কের এক সূক্ষ্ম যোগাযোগব্যবস্থা। আর এই অদৃশ্য প্রক্রিয়াটিই একটি বাগান বা বনকে বাইরে থেকে যতটা শান্ত মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ও পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত করে তোলে।
উদ্ভিদের যোগাযোগ বলতে আসলে কী বোঝায়?
উদ্ভিদের যোগাযোগ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়, কীভাবে গাছপালা তাদের পরিবেশ থেকে বিভিন্ন সংকেত শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা আশেপাশের অন্য উদ্ভিদকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে রাসায়নিক সতর্কবার্তা
কোনো গাছ পোকামাকড়ের আক্রমণ বা শারীরিক ক্ষতির শিকার হলে, সেটি বাতাসে কিছু উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দিতে পারে। আশেপাশের উদ্ভিদ এসব সংকেত শনাক্ত করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত একটি গাছের প্রতিক্রিয়া পাশের গাছগুলোর জন্য এক ধরনের আগাম সতর্কতার মতো কাজ করতে পারে।
কিছু উদ্ভিদ আবার এমন রাসায়নিক গন্ধ বা সংকেতও ছড়াতে পারে, যা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের প্রাকৃতিক শিকারিদের আকৃষ্ট করে। ফলে এই সংকেত শুধু উদ্ভিদ-উদ্ভিদ সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; একই সঙ্গে উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের মধ্যকার সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে।
শিকড় ও মাটির মাধ্যমেও চলে সংকেতের আদান-প্রদান
এই প্রক্রিয়ায় শিকড়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছপালা তাদের চারপাশের মাটিতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে, যেগুলোকে রুট এক্সুডেটস (root exudates) বলা হয়। এসব পদার্থ আশেপাশের উদ্ভিদ এবং মাটিতে থাকা অণুজীবের বৃদ্ধি, কার্যকলাপ ও পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
শিকড়ের নিঃসরণ বদলে দিতে পারে আশপাশের পরিবেশ
একটি গাছ তার শিকড়ের মাধ্যমে এমন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা তার নিজের পুষ্টি গ্রহণ বা টিকে থাকার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তন আশেপাশের উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে পাশের গাছগুলো মাটির রাসায়নিক পরিবেশে হওয়া এই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং নিজেদের বৃদ্ধি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। তাই এখানে মানুষের মতো কথোপকথন না থাকলেও সংকেত এবং তার প্রতিক্রিয়ার একটি বাস্তব প্রক্রিয়া কাজ করে।
মাটির নিচে ছত্রাক তৈরি করতে পারে বিশাল নেটওয়ার্ক
উদ্ভিদের পারস্পরিক সংযোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো মাইকোরাইজাল ছত্রাক (mycorrhizal fungi)। এই ছত্রাক উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব তৈরি করতে পারে। ছত্রাকের সূক্ষ্ম তন্তুগুলো মাটির নিচে ছড়িয়ে গিয়ে একাধিক উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
‘উড-ওয়াইড ওয়েব’ কতটা বাস্তব?
এই ধরনের ছত্রাকের সংযোগকে জনপ্রিয়ভাবে অনেক সময় ‘উড-ওয়াইড ওয়েব’ (wood-wide web) বলা হয়। এর মাধ্যমে উদ্ভিদ ও ছত্রাকের মধ্যে পুষ্টি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতের আদান-প্রদান ঘটতে পারে। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে এই সংযোগের মাধ্যমে একটি উদ্ভিদের অবস্থা অন্য উদ্ভিদকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
তবে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘উড-ওয়াইড ওয়েব’ শব্দটি একটি আকর্ষণীয় উপমা হলেও, উদ্ভিদের মধ্যে এই নেটওয়ার্ক কতটা ব্যাপকভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে কাজ করে, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। উদ্ভিদের পারস্পরিক যোগাযোগ সম্পর্কিত সব দাবি সমান শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

বিজ্ঞানীরা কোন বিষয়ে একমত, আর কোথায় রয়েছে বিতর্ক?
গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে যে উদ্ভিদ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত সংকেত শনাক্ত করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী শারীরবৃত্তীয় ও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক সংকেত এবং শিকড় ও মাইকোরাইজাল ছত্রাকের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মাটির নিচের সম্পর্কও উদ্ভিদজগতের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

গাছেরা মানুষের মতো ‘কথা’ বলে না
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দেন যে এসব প্রক্রিয়াকে মানুষের কথোপকথন বা সচেতন যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। গাছপালা মানুষের মতো চিন্তা করে বা ভাষা ব্যবহার করে—এমন প্রমাণ নেই।
তাদের পারস্পরিক সংকেত আদান-প্রদান মূলত রাসায়নিক প্রক্রিয়া, শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা পরিবেশগত সম্পর্কের মাধ্যমে ঘটে। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ এতে বৈজ্ঞানিক তথ্য যেমন সঠিক থাকে, তেমনি প্রকৃতির বিস্ময়ও কমে যায় না।
দৈনন্দিন জীবনে এই জ্ঞানের গুরুত্ব কী?
গাছপালা কীভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে পারলে বন, মাঠ কিংবা বাগানকে আর শুধু আলাদা আলাদা গাছের সমষ্টি হিসেবে দেখার প্রয়োজন হয় না। বরং এগুলোকে একটি জটিল ও পরস্পরসংযুক্ত জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা যায়।
এই ধারণা কৃষিকাজ, উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং বাগান পরিচর্যার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো একটি উদ্ভিদ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তার পরিবেশে তৈরি হওয়া পরিবর্তন আশেপাশের অন্যান্য উদ্ভিদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মাটির ওপর যা চোখে দেখা যায়, তার পাশাপাশি মাটির নিচে চলতে থাকা অসংখ্য প্রক্রিয়াও একটি উদ্ভিদ-সমাজের সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাহলে, গাছপালা কি সত্যিই শিকড় ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে? উত্তর হলো—হ্যাঁ, তারা বিভিন্ন উপায়ে একে অপরকে সংকেত দিতে এবং সেই সংকেতের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে এটি মানুষের মতো শব্দ বা ভাষায় কথাবার্তা নয়।
বিজ্ঞান মাটির নিচে কোনো ক্ষুদ্র কণ্ঠস্বরের কথা বলে না; বরং এটি তুলে ধরে সংকেত, প্রতিক্রিয়া, পুষ্টির আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক সম্পর্কের এক জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা। তাই পরের বার যখন একসঙ্গে বেড়ে ওঠা একগুচ্ছ গাছের দিকে তাকাবেন, মনে রাখতে পারেন—চোখের আড়ালে তাদের চারপাশে এমন অনেক প্রক্রিয়া চলছে, যার রহস্য বিজ্ঞান এখনও ধীরে ধীরে উন্মোচন করে চলেছে।