প্রাণী

চিড়িয়াখানার ভিন্ন প্রজাতি

চিড়িয়াখানায় রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হয়তো এমন কোনো দৃশ্য আপনার চোখে পড়েছে, যা বিশ্বাস করাই কঠিন।
চারপাশে দর্শনার্থীদের ভিড় আর ক্যামেরার ব্যস্ততার মাঝেও কখনও দেখা যায় সিংহের পাশে শান্তভাবে শুয়ে আছে অন্য কোনো প্রাণী, কচ্ছপের পিঠে আরামে বসে আছে টিয়া পাখি, কিংবা জিরাফ তার ছোট কোনো সঙ্গীর দিকে স্নেহভরা ভঙ্গিতে ঝুঁকে আছে।
দৃশ্যগুলো যেন গল্পের বই থেকে উঠে আসা কোনো কল্পকাহিনি। অথচ এমন আন্তঃপ্রজাতিক বন্ধন বাস্তবেই দেখা যেতে পারে।
এ থেকেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—চিড়িয়াখানায় প্রাণীরা কেন কখনও নিজেদের প্রজাতির বাইরে অন্য প্রাণীর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে?

বন্দিদশায় কেন এমন বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে

বন্য পরিবেশে প্রাণীদের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে খাবার খোঁজা, শিকারি থেকে বাঁচা এবং নিজেদের আবাসস্থল রক্ষা করা। সেখানে অনেক প্রাণী মূলত নিজেদের প্রজাতির সঙ্গেই থাকে এবং সম্ভাব্য শিকারি বা প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে দূরে থাকে। কিন্তু চিড়িয়াখানার পরিবেশ এই বাস্তবতাকে অনেকটাই বদলে দেয়।
এখানে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হয়, সম্ভাব্য শিকারি প্রাণীদের আলাদা রাখা হয় এবং দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদ কিছুটা কমে গেলে প্রাণীদের সামনে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, খেলাধুলা ও কৌতূহল প্রকাশের মতো আচরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রাণীদের অনেক প্রজাতিই স্বভাবগতভাবে সামাজিক। নিজেদের স্বাভাবিক দল বা সঙ্গীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে কিছু প্রাণী বিকল্প সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ খুঁজতে পারে। তখন একই পরিবেশে থাকা অন্য প্রজাতির কোনো প্রাণীও তাদের কাছে পরিচিত ও নিরাপদ সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে।
একটি চিতা ও একটি কুকুরের বন্ধুত্বের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রায়ই আলোচিত হয়। চিতা স্বভাবগতভাবে তুলনামূলক সংবেদনশীল ও সতর্ক হতে পারে, আর শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী কুকুর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার জন্য সামাজিক সঙ্গী হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এমন সম্পর্ক সব প্রাণীর ক্ষেত্রে একইভাবে তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায় এমন অদ্ভুত বন্ধন

ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক খুব সাধারণ ঘটনা নয়। তবে যখন এমন মিথস্ক্রিয়া দেখা যায়, তখন তা দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে এবং কখনও কখনও সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়।
বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী ও কুকুর
কিছু চিড়িয়াখানা বা বন্যপ্রাণী পরিচর্যা কেন্দ্রে চিতার মতো প্রাণীর সঙ্গে প্রশিক্ষিত কুকুরকে সামাজিক সঙ্গী হিসেবে রাখা হয়েছে। কুকুরের উপস্থিতি কিছু চিতাকে নতুন পরিবেশে তুলনামূলকভাবে স্বস্তি পেতে সাহায্য করতে পারে। তাদের পাশাপাশি হাঁটতে, খেলতে কিংবা বিশ্রাম নিতে দেখা যেতে পারে।
পাখি ও কচ্ছপ
বড় আকৃতির কচ্ছপের শক্ত খোলস কখনও কখনও পাখির জন্য একটি সুবিধাজনক বসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে। কোনো টিয়া পাখি বা অন্য পাখি কচ্ছপের পিঠে বসে থাকতে পারে, আর কচ্ছপও তাতে বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের মতো চলাফেরা করতে পারে। এখানে বন্ধুত্বের পাশাপাশি আরামদায়ক পরিবেশ ও পারস্পরিক সহনশীলতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
বানরজাতীয় প্রাণী ও ছোট প্রাণী
মিশ্র আবাসস্থলে বানরজাতীয় প্রাণীকে কখনও ছাগল বা হরিণের মতো প্রাণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে দেখা যায়। তারা একে অপরের কাছে বসতে, খেলতে বা শরীর পরিষ্কার করার মতো আচরণ করতে পারে। এমন মিথস্ক্রিয়া সবসময় পারস্পরিকভাবে উপকারী হবে—এমনটা বলা যায় না, তবে নিরাপদ পরিবেশে এগুলো সামাজিক উদ্দীপনা বাড়াতে পারে।
এ ধরনের মিথস্ক্রিয়া শুধু দেখতে আকর্ষণীয় নয়। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ, নতুন অভিজ্ঞতা ও খেলাধুলা প্রাণীদের পরিবেশগত সমৃদ্ধি বা social enrichment-এর অংশ হতে পারে। এতে তাদের স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের সুযোগ বাড়তে পারে এবং একঘেয়েমি কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ভিন্ন প্রজাতির বন্ধনের পেছনে কী বিজ্ঞান কাজ করে?

এ ধরনের সম্পর্ক তৈরির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। একই পরিবেশে দীর্ঘ সময় বসবাস, একে অপরের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া এবং স্বভাবের পার্থক্যের কারণে তৈরি হওয়া পরিপূরক সামাজিক আচরণ—সবই এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকা
প্রাণীরা যখন নিয়মিত একই জায়গায় থাকে, তখন তারা একে অপরের গন্ধ, শব্দ, চলাফেরা ও আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। সময়ের সঙ্গে অপর প্রাণীটি তাদের কাছে অচেনা বা হুমকিস্বরূপ না থেকে পরিচিত সঙ্গী হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
পরস্পরের স্বভাবের মিল
কোনো প্রাণী যদি তুলনামূলকভাবে শান্ত হয় এবং অন্যটি কৌতূহলী ও খেলাধুলাপ্রবণ হয়, তাহলে তাদের আচরণের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। একইভাবে, একটি প্রাণীর উপস্থিতি অন্য প্রাণীকে নতুন পরিবেশে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করতে পারে।
সামাজিক ও আবেগীয় প্রয়োজন
অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগ তাদের স্বাভাবিক আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাকীত্ব, পরিবেশগত চাপ বা সামাজিক সঙ্গীর অভাব থাকলে তারা বিকল্পভাবে অন্য প্রাণীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রাণীদের মানুষের মতো একই ধরনের আবেগ রয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে না গিয়ে তাদের আচরণকে প্রজাতিভেদে পর্যবেক্ষণ করাই বেশি বৈজ্ঞানিক।
মানুষের চোখে অদ্ভুত মনে হলেও প্রাণীদের কাছে পরিচিতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যেও কখনও এমন সম্পর্ক দেখা যায়, যা প্রচলিত প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়।

এই অদ্ভুত বন্ধুত্ব আমাদের কী শেখায়

একটি সিংহ ও একটি ছাগলকে শান্তভাবে পাশাপাশি থাকতে দেখা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তবে এমন দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রাণীদের সামাজিক আচরণ সবসময় কঠোরভাবে প্রজাতির সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপযুক্ত পরিবেশে কিছু প্রাণী অন্য প্রজাতির সদস্যের উপস্থিতিও সহ্য করতে বা তার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতে পারে।
চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ ও পরিবেশগত সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হলে তাদের স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের সুযোগ বাড়তে পারে। মেলামেশা, অনুসন্ধান, খেলাধুলা এবং নিজেদের মতো করে পরিবেশ ব্যবহার করার সুযোগ প্রাণীদের সামগ্রিক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের একসঙ্গে রাখা সবসময় নিরাপদ নয়। তাদের আকার, স্বভাব, শিকারি প্রবৃত্তি, খাদ্যাভ্যাস এবং আচরণগত সামঞ্জস্য বিবেচনা করেই এমন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কোনো প্রাণীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখা গেলেই যে তারা সব পরিস্থিতিতে নিরাপদে একসঙ্গে থাকতে পারবে, এমন নয়।

শেষ কথা

পরের বার চিড়িয়াখানায় গেলে শুধু খাবার খাওয়ার সময় বা পরিচিত খাঁচার দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রাণীদের পারস্পরিক আচরণও একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন। হয়তো দেখতে পাবেন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী শান্তভাবে পাশাপাশি বসে আছে, একে অপরের উপস্থিতি উপভোগ করছে কিংবা খেলাধুলায় ব্যস্ত।
এ ধরনের সম্পর্ক আগে থেকে নির্ধারিত কোনো গল্প নয়। পরিচিত পরিবেশ, নিরাপত্তা, সামাজিক প্রয়োজন, কৌতূহল এবং ব্যক্তিগত স্বভাব—বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করে এমন বন্ধন তৈরি করতে পারে।
একটি টিয়া পাখি যদি কচ্ছপের পিঠে বসে স্বস্তি পায়, কিংবা একটি চিতা যদি কুকুরের পাশে নিশ্চিন্তে অবস্থান করে, তাহলে সেই দৃশ্য আমাদের প্রাণীদের সামাজিক আচরণের বৈচিত্র্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতির জগতে সম্পর্কের ধরন সবসময় আমাদের প্রত্যাশামতো হয় না—আর সেই অপ্রত্যাশিত মিথস্ক্রিয়াগুলোই কখনও কখনও প্রাণীদের জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন