প্রাণী

বিড়াল কি মিশুক?

বিড়ালদের ব্যক্তিত্ব একেক রকম এবং কিছু বিড়াল স্বভাবগতভাবেই অন্যদের তুলনায় মানুষের সান্নিধ্যে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
কোনো বিড়াল হয়তো নির্জন কোণ বা নিজের জন্য আলাদা জায়গা পছন্দ করে, আবার অন্য কোনো বিড়াল আনন্দের সঙ্গে মানুষকে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে অনুসরণ করতে পারে।
আপনার বিড়ালটি কতটা মিশুক বা সামাজিক—তা নিয়ে কখনও ভেবে থাকলে, তার দৈনন্দিন আচরণ থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব। দরজায় এসে মানুষকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার চেষ্টা করা—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই প্রকাশ করে, অন্যদের উপস্থিতিতে বিড়ালটি কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

তারা প্রায়ই মানুষের কাছাকাছি থাকে

একটি মিশুক বিড়ালের অন্যতম স্পষ্ট লক্ষণ হলো মানুষের কাছাকাছি থাকার প্রবণতা। বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো বিড়াল হয়তো সোফায় কারও পাশে বসতে পছন্দ করবে, কেউ কাজ করার সময় তার কাছেই অবস্থান করবে অথবা বাড়ির সদস্যদের পিছু পিছু এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাবে।
এর অর্থ এই নয় যে বিড়ালটি সবসময় মনোযোগ বা আদর চাইছে। কখনও কখনও শুধু একই জায়গায় থাকা থেকেই বোঝা যায় যে, মানুষের সান্নিধ্যে বিড়ালটি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। কাছাকাছি থেকেও নিজের মতো বিশ্রাম নেওয়া তার সামাজিক স্বভাবের একটি স্বাভাবিক প্রকাশ হতে পারে।

তারা মানুষকে স্বাগত জানায়

মিশুক বিড়ালরা মানুষকে স্বাগত জানানোর জন্য নিজেদের কিছু বিশেষ ভঙ্গি বা রুটিন তৈরি করে নিতে পারে। পরিচিত কেউ ঘরে ঢুকলে তারা হয়তো তার দিকে এগিয়ে যায়, লেজ উঁচু করে ধরে, মৃদু শব্দ করে অথবা মানুষের পায়ে গা ঘষে।
কেউ বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে এই আচরণগুলো আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়তে পারে। যে বিড়াল নিয়মিত লুকিয়ে না থেকে মানুষের কাছে এগিয়ে আসে, সে সাধারণত মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য ও আগ্রহ প্রকাশ করছে। তবে প্রতিটি বিড়ালের স্বাগত জানানোর ধরন আলাদা হতে পারে।

তারা আলতো আদর বা মনোযোগ চায়

মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সময় বিড়ালের প্রতিক্রিয়াও তার সামাজিক স্বভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে। মিশুক বিড়াল প্রায়ই আলতো আদর, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া অথবা শান্তভাবে মনোযোগ পাওয়ার আশায় মানুষের কাছে আসে।
কোনো কোনো বিড়াল মনোযোগ চাইলে মাথা দিয়ে মানুষের হাত আলতো করে ঠেলে দিতে পারে অথবা কারও পাশে গিয়ে বসতে পারে। যে বিড়াল আদর বা মনোযোগ উপভোগ করে, তার শারীরিক ভঙ্গি সাধারণত বেশ শিথিল থাকে। কান স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, শরীর টানটান না হয়ে আরামদায়ক থাকে এবং আদর পাওয়ার পরও সে মানুষের কাছাকাছি থাকতে পারে।
তবে বিড়ালের কখন বিরতি বা একান্ত সময় প্রয়োজন, সেটিও বোঝা জরুরি। মিশুক বিড়ালেরও মাঝে মাঝে নিজের মতো থাকার প্রয়োজন হতে পারে। কোনো বিড়াল যদি সেখান থেকে সরে যায়, অবস্থান পরিবর্তন করে অথবা আগের মতো শিথিল না থাকে, তাহলে সে হয়তো কিছুটা ব্যক্তিগত জায়গা বা বিশ্রামের সময় চাইছে।

তাদের শারীরিক ভঙ্গি থাকে শিথিল

শারীরিক ভঙ্গি বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বিড়ালের স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা সম্পর্কে অনেক কিছু বোঝা যায়। একটি নিশ্চিন্ত বিড়াল মানুষের আশেপাশে শরীর ছড়িয়ে শুয়ে থাকতে পারে, আরাম করে বিশ্রাম নিতে পারে, ধীরে ধীরে চোখের পলক ফেলতে পারে অথবা শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকতে পারে।
ধীরে চোখের পলক ফেলা বা ‘স্লো ব্লিংকিং’ (slow blinking) প্রায়ই বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে দেখা যায়। আবার কোনো বিড়াল যদি মানুষের কাছাকাছি একপাশে কাত হয়ে আরাম করে শুয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তার পরিবেশকে নিরাপদ মনে করার ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে কোনো একটি আচরণ দেখেই বিড়ালের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সামগ্রিক আচরণ এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একবার ধীরে চোখের পলক ফেলাই বিড়ালের স্বভাবের চূড়ান্ত পরিচয় নয়; তবে মানুষের উপস্থিতিতে নিয়মিত এমন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ আচরণ তার সামাজিক স্বভাবের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত হতে পারে।

তারা মানুষের সঙ্গে খেলাধুলা উপভোগ করে

খেলাধুলার মাধ্যমেও বিড়ালের সামাজিক বা মিশুক স্বভাব বোঝা যায়। কিছু মিশুক বিড়াল মানুষের সঙ্গে খেলতে বা মিথস্ক্রিয়া করতে বিশেষভাবে পছন্দ করে। যেমন—খেলনা তাড়া করা, কোনো বস্তুতে থাবা মারা অথবা অল্প সময়ের জন্য খেলায় অংশ নেওয়া।
যে বিড়াল নিয়মিত কোনো খেলনা নিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অথবা কেউ খেলার উদ্যোগ নেবে বলে অপেক্ষা করে, সে হয়তো যৌথ খেলাধুলায় বিশেষ আগ্রহী। জোর করে শারীরিক সংস্পর্শে না গিয়েও পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার একটি ইতিবাচক উপায় হতে পারে খেলাধুলা।
তবে সব মিশুক বিড়াল একই ধরনের খেলা পছন্দ করে না। কেউ প্রাণবন্ত ও দ্রুত নড়াচড়া করা খেলায় বেশি আগ্রহী হতে পারে, আবার কেউ ধীরস্থির ও নিয়ন্ত্রিত খেলাধুলা পছন্দ করতে পারে। তাই বিড়ালের নিজস্ব পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

পরিচিত দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে

দর্শনার্থীদের প্রতি বিড়ালের প্রতিক্রিয়াও তার স্বভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে। একটি মিশুক বিড়াল অপরিচিত কাউকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর ধীরে ধীরে তার কাছে যেতে পারে। সে সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে পারে, একই ঘরে অবস্থান করতে পারে অথবা শেষ পর্যন্ত মানুষের আলতো আদর ও মনোযোগ গ্রহণ করতে পারে।
এক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিশুক হওয়ার অর্থ এই নয় যে বিড়ালকে প্রত্যেক দর্শনার্থীর কাছে সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে পরিচিত হতে হবে। কাছে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হতে পারে।
আসল বিষয় হলো, বিড়ালটি শেষ পর্যন্ত পরিচিত বা নতুন মানুষের সান্নিধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে কি না। যদি সে নিয়মিত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বা সবসময় লুকিয়ে থাকে, তাহলে তার আচরণকে মিশুক স্বভাবের বিপরীত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এর পেছনে ব্যক্তিত্ব ছাড়াও পরিবেশ, পূর্বের অভিজ্ঞতা বা পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে।
মিশুক বিড়াল মানেই যে তাকে সবসময় খুব আদরপরায়ণ হতে হবে বা সবার সঙ্গে পরিচিত হতে উদগ্রীব থাকতে হবে—তা নয়। সামাজিক বা মিশুক স্বভাব নানা ছোট ছোট আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। কাছাকাছি থাকা, পরিচিত মানুষকে দেখে সাড়া দেওয়া, আলতো আদর বা মনোযোগ চাওয়া, খেলাধুলায় অংশ নেওয়া এবং শরীরী ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ—সবকিছু মিলিয়েই বিড়ালের সামাজিকতার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
বিড়ালের ব্যক্তিত্ব বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দীর্ঘ সময় ধরে তার আচরণের ধরন পর্যবেক্ষণ করা। মিথস্ক্রিয়ার আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি তার নিজস্ব সীমা ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি সম্মান দেখালে মানুষের সঙ্গে বিড়ালের একটি সুন্দর ও আরামদায়ক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি মিশুক বিড়াল হয়তো খুব শান্তভাবেই তার বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের সেই ছোট ছোট সংকেতগুলোই তার ব্যক্তিত্বকে চিনে নেওয়াকে আশ্চর্যজনকভাবে সহজ করে তোলে।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন