প্রাণী
সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া তেল
প্রিয় পাঠক, সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে পড়া তেল মানেই শুধু টেবিলক্লথে কফি পড়ে তৈরি হওয়া কোনো সাধারণ দাগ নয়। এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—কখনও কয়েক বছর, আবার কখনও তারও বেশি সময় ধরে।
কতদিন এই প্রভাব থাকবে, তা নির্ভর করে তেল কোথায় ছড়িয়েছে, কী পরিমাণ তেল নির্গত হয়েছে, তেলের ধরন কী এবং কত দ্রুত পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে—এসব বিষয়ের ওপর।
সমুদ্রে পড়ার পরপরই তেলের মধ্যে নানা ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। এর কিছু অংশ বাষ্পীভূত হয়ে যায়, কিছু পানিতে মিশে যায়, কিছু ছোট ছোট ফোঁটায় ভেঙে পড়ে এবং কিছু ভেসে তীরে চলে আসে। আবার কিছু তলানি, বালু বা অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশে পরিবেশে আটকে থাকতে পারে।
দূর থেকে মনে হতে পারে তেল ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। দূষণের একটি অংশ পুরোপুরি অদৃশ্য না হয়ে কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। খোলা সমুদ্র থেকে তেল জলাভূমি, সমুদ্রসৈকত, সমুদ্রতলদেশের আবাসস্থল এবং উপকূলীয় খাদ্যশৃঙ্খলে পৌঁছাতে পারে। সেখানে এটি অনেকটা কোনো অনুষ্ঠানের পরও থেকে যাওয়া ঝিকিমিকি কণার মতো দীর্ঘদিন পরিবেশে উপস্থিত থাকতে পারে।
সময়ের ব্যাপ্তি কেন ভিন্ন হয়
পরিবেশের ওপর তেল নিঃসরণের প্রভাব কতদিন স্থায়ী হবে, তা বেশ কয়েকটি পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে তেলের ধরন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হালকা ধরনের তেল দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে এবং বাষ্পীভূত হতে পারে। অন্যদিকে ভারী তেল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এবং উপকূলরেখা, উদ্ভিদ, পাথর কিংবা সমুদ্রতলদেশে জেদি আস্তরণ তৈরি করতে পারে।
স্থান ও পরিবেশগত পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। উষ্ণ ও খোলা সমুদ্রে থাকা তেল ঠান্ডা পরিবেশ, জলাভূমি, জোয়ার-ভাটা অঞ্চল কিংবা সুরক্ষিত উপকূলীয় এলাকায় আটকে থাকা তেলের তুলনায় দ্রুত পরিবর্তিত বা ভেঙে যেতে পারে। এসব সংবেদনশীল এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে তেল অপসারণের প্রক্রিয়া ধীর হওয়ায় দূষণ দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যেতে পারে।
তেল ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ ও বিস্তৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢেউ এবং সূর্যের আলোযুক্ত সক্রিয় কোনো এলাকায় অল্প পরিমাণ তেল ছড়িয়ে পড়লে তা তুলনামূলক দ্রুত কমে যেতে পারে। কিন্তু বড় ধরনের তেল নিঃসরণ যদি মাছের প্রজননক্ষেত্র কিংবা অন্যান্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলে পৌঁছে যায়, তাহলে এর প্রভাব পুরো বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তেল পরিষ্কারের তৎপরতাও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত তেল আটকে ফেলা ও অপসারণের মাধ্যমে ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব। তবে পরিষ্কারের কাজ সবসময় তেলের প্রতিটি অংশে পৌঁছাতে পারে না, বিশেষ করে উপকূলের সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর আবাসস্থলে।
এটি কতদিন স্থায়ী হতে পারে?
এনওএএ (NOAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, তেল নিঃসরণের কারণে মাছ, শেলফিশ—যেমন কাঁকড়া ও ঝিনুক—সামুদ্রিক পাখি এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি হলেও, অন্য ক্ষেত্রে তা কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এর কোনো নির্দিষ্ট বা সবার জন্য একই সময়সীমা নেই। বাসস্থান পুনরুদ্ধার হতে শুরু করলে এবং খাদ্যের জোগান স্বাভাবিক হলে কিছু বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আবার বাড়তে পারে। তবে অনেক প্রাণী দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে, কারণ তেল তাদের প্রজনন, বৃদ্ধি, খাদ্য সংগ্রহ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কিংবা আশ্রয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
উপকূলীয় আবাসস্থলগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন অনেকটা প্রকৃতির স্পঞ্জ ও ফিল্টারের মতো কাজ করে। কিন্তু একবার তেল এসব এলাকার শিকড় এবং তলানির মধ্যে ঢুকে গেলে সেখান থেকে তা অপসারণ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
পানির ওপরের তেলের আস্তরণ সরে গেলেও যেসব প্রাণী ওই এলাকায় খাবার খোঁজে বা আশ্রয় নেয়, তারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থলের প্রভাবের মুখোমুখি হতে পারে। তলানি বা পলিমাটিও অনেকটা গোপন আধারের মতো কাজ করতে পারে—দূষক সেখানে আটকে থাকতে পারে এবং পরে ধীরে ধীরে আবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাস্তুতন্ত্রের ভেতরে যা ঘটে
তেল সামুদ্রিক প্রাণীদের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি পাখির পালক কিংবা প্রাণীর লোমে আস্তরণ তৈরি করতে পারে, যার ফলে শরীর উষ্ণ রাখা বা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তেল ডিম ও লার্ভার ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। জীবনের এই প্রাথমিক পর্যায়গুলো বিশেষভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় এসব ক্ষতি পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো প্রজাতির সংখ্যা পুনরুদ্ধারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মাছ এবং খোলসযুক্ত সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন কাঁকড়া ও ঝিনুক, সরাসরি দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে কিংবা দূষিত আবাসস্থল ও খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এরপর আসে খাদ্যশৃঙ্খলের বিষয়টি। বিষয়টি অনেকটা একটি সাজানো টাওয়ারের মাঝখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে নেওয়ার মতো। যদি ছোট প্রাণীর সংখ্যা কমে যায়, তাহলে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরের প্রাণীরা তাদের প্রয়োজনীয় শিকার বা খাদ্যের উৎস হারাতে পারে।
উপকূলীয় উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হলে বাসা বাঁধা ও প্রজননের উপযুক্ত স্থানও কমে যেতে পারে। এমনকি কোনো প্রাণী ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে গেলেও, আবাসস্থল পুনর্গঠন এবং প্রাণীর সংখ্যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসা পর্যন্ত পুরো বাস্তুতন্ত্রে ভারসাম্যহীনতা বজায় থাকতে পারে।
তাহলে, কত বছর সময় লাগে?
এর একটি বাস্তবসম্মত উত্তর হলো—তেল নিঃসরণের পরিবেশগত প্রভাব কয়েক বছর থেকে শুরু করে কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান ক্ষতি এবং অনেক জৈবিক প্রভাব কয়েক বছরের মধ্যেই কমে আসতে পারে।
তবে সংবেদনশীল আবাসস্থলে, বিশেষ করে যেখানে তেল তলানি বা উপকূলীয় উদ্ভিদের মধ্যে আটকে থাকে, সেখানে এর প্রভাব কয়েক দশক ধরে চলতে পারে। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণেই তেল নিঃসরণের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
শুরুতে যে তেলের আস্তরণ বা দূষণ চোখে পড়ে, সেটি পুরো সমস্যার কেবল একটি অংশ। আরও গভীর বিষয় হলো, দূষিত উপাদান পরিবেশের বিভিন্ন অংশে কতদিন থেকে যায় এবং সামুদ্রিক প্রাণী ও আবাসস্থলকে কতদিন প্রভাবিত করে।
তাই একটি ছোট ছিদ্র বা তেল নিঃসরণও দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত ছাপ ফেলতে পারে। সমুদ্রের নিজস্ব পুনরুদ্ধার ক্ষমতা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি কোনো জাদুকরী স্বয়ংক্রিয় পরিষ্কারক ব্যবস্থা নয়। পুনরুদ্ধারের গতি নির্ভর করে আবাসস্থল, প্রজাতি, তেলের ধরন, দূষণের পরিমাণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের ওপর।
একটি নির্দিষ্ট সময়রেখা ধরে প্রতিটি তেল নিঃসরণের ঘটনা বিচার করার পরিবর্তে, প্রতিটি ঘটনার পর পরিবেশ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে কীভাবে পুনরুদ্ধার করছে, তা পর্যবেক্ষণ করাই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।