উদ্ভিদ

পরজীবী গাছ পুষ্টি চুরি করে

প্রিয় পাঠক, অধিকাংশ উদ্ভিদই যেন একেকটি ছোট্ট সবুজ রান্নাঘর। তারা সূর্যের আলো, পানি ও বাতাস ব্যবহার করে নিজেরাই প্রয়োজনীয় খাবার তৈরি করে। কিন্তু পরজীবী উদ্ভিদ এই প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম।
নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার তৈরি করার পরিবর্তে তারা অন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে—অনেকটা এমন এক অতিথির মতো, যে শুধু অন্যের খাবারই খায় না, বরং নিজের প্রয়োজনের অনেক কিছুই সেই বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে।
একটি পরজীবী উদ্ভিদ কোনো পোষক উদ্ভিদের (host plant) সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার প্রয়োজনীয় উপাদান শুষে নেয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ‘হস্টোরিয়াম’ (haustorium) নামের একটি বিশেষ অঙ্গ। একে উদ্ভিদের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা সূক্ষ্ম পাইপলাইনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এটি পোষক উদ্ভিদের কলার (tissues) ভেতরে প্রবেশ করে এবং তার অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে পরজীবী উদ্ভিদ পানি ও দ্রবীভূত খনিজ উপাদান এবং অনেক ক্ষেত্রে পোষক উদ্ভিদের তৈরি শর্করা ও অন্যান্য পুষ্টিও নিজের প্রয়োজনে গ্রহণ করতে পারে।

সংযোগটি যেভাবে কাজ করে

পুরো প্রক্রিয়ার মূল চাবিকাঠি হলো হস্টোরিয়াম। পোষক উদ্ভিদের সংস্পর্শে আসার পর এটি এমন সব কলার সঙ্গে যুক্ত হয়, যেগুলো উদ্ভিদের শরীরের ভেতরে পানি, খনিজ ও অন্যান্য উপাদান পরিবহন করে। কিছু পরজীবী মূলত পানি ও খনিজের ওপর নির্ভর করে, আবার অন্যরা সরাসরি জৈব পুষ্টি উপাদানও গ্রহণ করে।
এর ফলে তারা খুব সামান্য সালোকসংশ্লেষণ করেও, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই সালোকসংশ্লেষণ না করেও টিকে থাকতে পারে। সহজভাবে বললে, তারা নিজেরা পুরো রান্নাঘর চালানোর বদলে অন্য উদ্ভিদের তৈরি খাদ্য ও সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করে।
প্রজাতিভেদে পরজীবী উদ্ভিদ পোষক উদ্ভিদের কাণ্ড বা মূল—দুইয়ের যেকোনো অংশের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারে। কোনো কোনো প্রজাতি মাটির ওপরে থাকা কাণ্ড বা শাখাকে জড়িয়ে ধরে, আবার কোনোটি মাটির নিচে থাকা মূলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। পদ্ধতি আলাদা হলেও মূল কৌশল একই—পোষক উদ্ভিদ হয়ে ওঠে সম্পদের উৎস, আর পরজীবী উদ্ভিদ সেই উৎস থেকে নিজের প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে।

নির্ভরশীলতার বিভিন্ন মাত্রা

সব পরজীবী উদ্ভিদ একই মাত্রায় পোষকের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিছু উদ্ভিদের মধ্যে ক্লোরোফিল থাকে এবং তারা সীমিত পরিমাণে সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে। এদের প্রায়ই ‘আংশিক পরজীবী’ বলা হয়। তারা নিজেদের কিছু খাদ্য তৈরি করলেও পানি ও খনিজ উপাদানের জন্য—এবং কখনও অতিরিক্ত পুষ্টির জন্যও—পোষক উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে।
এদের এমন কারও সঙ্গে তুলনা করা যায়, যিনি হয়তো নিজের সকালের খাবার তৈরি করেন, কিন্তু দিনের অন্য সময়ের খাবারের জন্য প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করেন।
অন্যদিকে রয়েছে ‘পূর্ণাঙ্গ পরজীবী’ উদ্ভিদ। এসব উদ্ভিদে ক্লোরোফিল থাকে না বা সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে তারা প্রায় পুরোপুরি পোষক উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে। নিজেরা পর্যাপ্ত খাবার তৈরি করতে না পারায় পোষক উদ্ভিদের জীবন্ত পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করাই তাদের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান উপায়।

কেন এই কৌশলটি কার্যকর

এই জীবনধারাকে প্রথম দেখায় হয়তো সহজ পথ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির দৃষ্টিতে এটি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি কার্যকর কৌশল। অন্য উদ্ভিদের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরজীবী উদ্ভিদ এমন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে, যেখানে নিজের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য তৈরি করা কঠিন বা তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক।
সালোকসংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল ও বিস্তৃত জৈব কাঠামো গড়ে তোলা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণের পরিবর্তে তারা তাদের শক্তির বড় অংশ পোষক উদ্ভিদ খুঁজে বের করা, তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং বংশবিস্তারের মতো কাজে ব্যবহার করতে পারে।
তবে এই সম্পর্ক পোষক উদ্ভিদের জন্য সবসময় সুবিধাজনক নয়। পরজীবী উদ্ভিদ পানি, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি গ্রহণ করার ফলে পোষক উদ্ভিদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। পরজীবীর সংখ্যা কম হলে পোষক উদ্ভিদ হয়তো সেই চাপ সামলে নিতে পারে। কিন্তু ব্যাপকভাবে পরজীবী উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়লে পোষক উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সামগ্রিক জীবনীশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফসলের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিছু পরজীবী উদ্ভিদ সরাসরি মূল বা কাণ্ডের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রয়োজনীয় সম্পদ গ্রহণ করে। ফলে আক্রান্ত ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং উৎপাদনও কমে যেতে পারে।

প্রকৃতির এক চতুর ও সংক্ষিপ্ত পথ

পরজীবী উদ্ভিদ নিজের খাবার সম্পূর্ণভাবে তৈরি না করেও অন্য উদ্ভিদের জীবন্ত পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। তাদের ‘হাউস্টোরিয়া’ (haustoria) বা বিশেষ শোষণ-অঙ্গ পানি, খনিজ লবণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকেই তৈরি পুষ্টি উপাদান গ্রহণের প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করে।
কিছু পরজীবী উদ্ভিদ সীমিত পরিমাণে সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে, আবার অন্যরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে পোষক উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। তাই পরের বার যখন মনে হবে যে প্রতিটি উদ্ভিদই রোদের আলোয় দাঁড়িয়ে নীরবে নিজের খাবার তৈরি করছে, তখন উদ্ভিদজগতের এই ব্যতিক্রমী ‘পরগাছাদের’ কথাও মনে রাখুন।
তারা আশেপাশের উদ্ভিদকে নিজেদের জন্য জীবন্ত সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত করে বেঁচে থাকে। প্রকৃতির বিচিত্র কৌশলের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ উদাহরণ—যেখানে বেঁচে থাকার জন্য নিজের রান্নাঘর তৈরি করার বদলে অন্যের তৈরি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়াই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

আপনার পছন্দের তালিকা

দেখার জন্য একটি তালিকা বেছে নিন