উদ্ভিদ
ফটোট্রপিজমের রহস্য
কোনো গাছকে ভুল জায়গায় রাখলে সেটি এমন আচরণ করতে শুরু করে, যেন কোনো অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে রোদমাখা শেষ আসনটি খুঁজে বেড়াচ্ছে।
একদিন হয়তো গাছটিকে একদম ঠিকঠাক দেখায়, কিন্তু পরদিন দেখা যায় সেটি একদিকে হেলে পড়ছে, লম্বা হচ্ছে এবং এমনভাবে বাড়ছে, যা দেখে মনে হয় এর বৃদ্ধি একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। গাছটি কিন্তু কোনো নাটকীয়তা করছে না; বরং তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
এর মূল কারণ হলো আলো। যখন আলো মূলত একপাশ থেকে আসে, তখন গাছ সমানভাবে বাড়ে না। এর বদলে গাছটি আলোর উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কাণ্ড ও পাতাগুলো আঁকাবাঁকা, মোচড়ানো বা একপাশে হেলে পড়া অবস্থায় দেখা দিতে পারে। আলোর প্রভাবে গাছের এই বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফটোট্রপিজম’ (phototropism)।
সহজ কথায়, এর অর্থ হলো আলোর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গাছ তার বেড়ে ওঠার দিক পরিবর্তন করে। গাছের ওপরের অংশ বা কাণ্ড সাধারণত ‘পজিটিভ ফটোট্রপিজম’ বা ধনাত্মক আলোক-অভিমুখীতা প্রদর্শন করে, অর্থাৎ সেগুলো আলোর দিকেই বাড়ে। অন্যদিকে, শিকড় প্রায়শই এর বিপরীত আচরণ করে এবং আলো থেকে দূরে সরে যায়।
এই প্রক্রিয়ার ফলে গাছ তার পাতাগুলোকে এমন জায়গায় মেলে ধরতে পারে, যেখানে আলোর তীব্রতা বেশি। এতে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরির সুযোগ বাড়ে। তাই আপনার গাছটি যদি কোনো অন্ধকার কোণে রাখা থাকে এবং আলো কেবল একটি জানালা দিয়ে আসে, তাহলে মূলত সেটি সারাদিন ধরে ধীরগতিতে নিজের শরীর প্রসারিত করার বা মোচড়ানোর মতো এক ধরনের ‘ব্যায়াম’ই করতে থাকে।
গাছ কীভাবে বেঁকে যায়
অক্সিন গাছের বৃদ্ধির দিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
গাছের এই বেঁকে যাওয়ার বিষয়টি ‘অক্সিন’ (auxin) নামক এক ধরনের সংকেতবাহী রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এগুলো হলো এক ধরনের বৃদ্ধি-নিয়ন্ত্রক হরমোন, যা কোষের প্রসারণ বা বড় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
যখন কোনো গাছের ওপর একপাশ থেকে আলো পড়ে, তখন অক্সিনের বণ্টনে পরিবর্তন ঘটে এবং এর বেশি অংশ কাণ্ডের ছায়াযুক্ত দিকে জমা হয়। ফলে আলোকিত অংশের তুলনায় ছায়াযুক্ত অংশের কোষ বেশি প্রসারিত হয়। বিষয়টিকে রশি টানাটানির খেলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে একটি দলের সঙ্গে হঠাৎ করে বাড়তি কিছু সাহায্যকারী যোগ দেয়। এর ফলেই গাছটি আলোর দিকে বেঁকে যেতে শুরু করে।
এ কারণেই জানালার পাশে রাখা গাছ সোজাসুজি ওপরের দিকে না বেড়ে প্রায়শই জানালার দিকে হেলে পড়ে।

ভুল অবস্থান কেন পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে
অপর্যাপ্ত ও অসমান আলো গাছের আকৃতি বদলে দিতে পারে
ভুল জায়গায় রাখার ফলে সামান্য হেলে পড়ার সমস্যাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে গাছটি দেখতে অনেকটা জট পাকানো স্প্যাগেটির মতো হয়ে যায়। যদি গাছটি সামগ্রিকভাবে খুব কম আলো পায়, তবে আলোর সন্ধানে এটি অস্বাভাবিক লম্বা ও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আসবাবপত্রের আড়ালে চাপা পড়ে থাকলে, পর্দার আড়ালে ঢাকা থাকলে কিংবা আলোর উৎস থেকে অনেক দূরে রাখা হলে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধির সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকে, কিন্তু আলোর বণ্টন অসমান হওয়ায় এর প্রতিটি নতুন অংশ হয়তো আরও কিছুটা বেঁকে যেতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফলে সেই আঁকাবাঁকা ও অদ্ভুত আকৃতি তৈরি হয়, যা সহজেই সবার চোখে পড়ে।
শুধু আলোই নয়
মাধ্যাকর্ষণ ও আশপাশের পরিবেশও গাছের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে
এখানে আলোই প্রধান ভূমিকা পালন করে ঠিকই, কিন্তু এটি একমাত্র নিয়ামক নয়। ‘গ্র্যাভিট্রপিজম’ বা অভিকর্ষ-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও গাছের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। এটিই শিকড়কে সাধারণত মাটির গভীর দিকে এবং কাণ্ডকে উপরের দিকে বাড়তে সাহায্য করে।
টব যদি কাত হয়ে থাকে, ঘনঘন ধাক্কা খায় কিংবা এমন জায়গায় রাখা হয় যেখানে কাণ্ড পর্যাপ্ত অবলম্বন পায় না, তাহলে নিজেকে সোজা করার চেষ্টায় গাছটি অদ্ভুত আকৃতি ধারণ করতে পারে। আশপাশে কোনো বাধা থাকলে পাতা ও কাণ্ড সেগুলোকে এড়িয়ে বা ঘুরে বেড়ে উঠতে পারে।
তবে অধিকাংশ বাড়িতে টবের গাছ বেঁকে যাওয়ার পেছনে অসমান আলোই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায়।

গাছকে সোজাভাবে বাড়তে সাহায্য করার উপায়
আলোর দিক ও পরিমাণ ঠিক করুন
সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো আলোর ব্যবস্থা উন্নত করা। সম্ভব হলে গাছটিকে এমন কোনো উজ্জ্বল জায়গায় সরিয়ে নিন, যেখানে পর্যাপ্ত ও তুলনামূলকভাবে সমান আলো পাওয়া যায়।
নিয়মিত টব ঘুরিয়ে দিন
নিয়মিত টব ঘুরিয়ে দেওয়াটাও বেশ কার্যকর। এতে গাছের বিভিন্ন পাশ পর্যায়ক্রমে আলোর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে গাছটি কোনো এক দিকে স্থায়ীভাবে হেলে না পড়ে আরও সুষমভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
প্রয়োজনে গ্রো-লাইট ব্যবহার করুন
প্রাকৃতিক আলো কম হলে সঠিক স্থানে একটি ‘গ্রো-লাইট’ (কৃত্রিম আলোর উৎস) বসিয়ে আলোর বণ্টন উন্নত করা যেতে পারে। এতে ঘরের অপেক্ষাকৃত অন্ধকার জায়গাতেও গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী আলো দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অতিরিক্ত বেঁকে গেলে অবলম্বন দিন
যেসব গাছ খুব বেশি বেঁকে গেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে খুঁটি বা অন্য উপযুক্ত অবলম্বন দিয়ে আলতো করে সোজা রাখা যেতে পারে, যাতে নতুন অংশগুলো আরও সুষমভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
বেঁকে যাওয়া মানেই গাছের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি তার টিকে থাকার এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল—যেন কোনো ছোট্ট সবুজ অ্যাক্রোব্যাট আলোর উৎসের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। আপনার গাছটি যদি আঁকাবাঁকাভাবে বেড়ে ওঠে, তাহলে তাকে দোষ দেওয়ার আগে দেখুন সেটি কোথায় রাখা আছে। অবস্থানের সামান্য পরিবর্তনই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত আলো এবং সামান্য ধৈর্যের সঙ্গে নতুন পাতা ও ডালপালা অনেক বেশি সুষমভাবে বেড়ে উঠতে পারে।